দুবাই-তেলআবিব রুটে ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজ নাশকতার চেষ্টা এবং ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে ছুরিকাঘাত করা সহকারী পাইলট হামাম আলহামামিকে উড়োজাহাজ চালানো থেকে আগে নিষিদ্ধ করেছিল তার নিজ দেশ ওমান। উগ্রপন্থি মতাদর্শে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কায় তাকে উড়োজাহাজ চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামাম আলহামামি ওমানের নাগরিক। সংযুক্ত আরব আমিরাতে জন্ম নেওয়া তার বাবা ওমানি এবং মা সিরীয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, হামামি বেশিরভাগ সময় ওমানের বাইরে, বিশেষ করে সিরিয়ায় কাটিয়েছেন। সেখানে তিনি উগ্রপন্থি মতাদর্শে প্রভাবিত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালে ওমান এয়ারে সহকারী পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় হামামির কাছে উগ্রপন্থি উপকরণ পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তাকে প্রশাসনিক পদে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে শনাক্ত করে উড়োজাহাজ চালানো থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে ওই নিষেধাজ্ঞার পরও দুবাইভিত্তিক বিমান সংস্থা ফ্লাইদুবাই তাকে নিয়োগ দেয়। এর ফলে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত-ইসরায়েল রুটে উড়োজাহাজ চালানোর সুযোগ পান তিনি। প্রতিবেদনগুলোতে আরও দাবি করা হয়েছে, ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটি ইসরায়েলে বিধ্বস্ত করার পরিকল্পনা ছিল হামামির।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগে হামামি মাত্র আট মাস ওই সংস্থায় কাজ করেছিলেন। হামাম আলহামামি নামে এখন মুছে ফেলা একটি লিংকডইন প্রোফাইলে দাবি করা হয়েছিল, তিনি সাত বছর ওমান এয়ারে কাজ করেছেন এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেখান থেকে চাকরি ছাড়েন।
এরপর ২০২৫ সালের জুনে তিনি রয়্যাল এয়ার মারক-এ যোগ দেন এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে চাকরি ছাড়ার পর ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন বলে ওই প্রোফাইলে উল্লেখ ছিল। ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনার প্রায় নয় ঘণ্টার মধ্যে ওই প্রোফাইল থেকে দুটি পোস্ট দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দুটিই ছিল সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত।
প্রথম পোস্টে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজের ককপিটের কয়েকটি ভিডিও দেখা যায়। ভিডিওতে ইসরায়েলি বিমান সংস্থা এল আলের একটি উড়োজাহাজের দিকে ক্যামেরা জুম করা হয়। পরে ভিডিওটি আল-কায়েদার সাবেক নেতা ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর সংগঠনটির নেতৃত্ব দেওয়া আয়মান আল-জাওয়াহিরি এবং ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আত্মঘাতী হামলায় নয়জনকে হত্যা করা হুমাম খলিল আবু-মুলাল আল-বালাওয়ির ছবি দিয়ে শেষ হয় বলে সিএনএন জানিয়েছে।
অন্য একটি পোস্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি মক্কা, মদিনা ও জেরুজালেমের তিন পবিত্র স্থানের ছবি ছিল। পেছনে থাকা কবিতায় অপমান প্রত্যাখ্যান, মৃত্যুকে ভয় না পাওয়া এবং মর্যাদা রক্ষার কথা বলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিএনএনের আরেক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামামির মুছে ফেলা এক্স অ্যাকাউন্টে তাকে ধর্মপ্রাণ এবং নারীবিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। চলতি সপ্তাহের শুরুতে হামামি ১৭০ জনের বেশি যাত্রী নিয়ে ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটি নাশকতার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ। যাত্রীদের মধ্যে ২৪ জন শিশু ছিল। পরে তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে ছুরিকাঘাত করেন তিনি।
প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজটি হঠাৎ দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। একপর্যায়ে প্রতি মিনিটে প্রায় ২৩ হাজার ফুট গতিতে নিচে নামতে নামতে এটি প্রায় ১৫ হাজার ৬০০ ফুট উচ্চতায় নেমে আসে।
আহত হওয়ার পরও ক্যাপ্টেন মাচ্ছার ককপিটের দরজা খুলে দেন। এরপর উড়োজাহাজের ক্রু ও যাত্রীরা হামামিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে উড়োজাহাজের ভেতরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা যায়। ককপিটের বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ক্যাপ্টেন মাচ্ছারকে বলতে শোনা যায়, তার সহকারী পাইলট তাকে আঘাত করেছেন।
সামনের দিকে থাকা কয়েকজন যাত্রী হামামিকে ককপিট থেকে দূরে সরিয়ে নেন। তাদের মধ্যে ইয়ানিভ হায়ুন সহকারী পাইলটকে ধরে শ্বাসরোধ করে ককপিট থেকে দূরে সরিয়ে দেন। এ সময় একজন দন্ত চিকিৎসক আহত ক্যাপ্টেন মাচ্ছারকে জরুরি চিকিৎসা দিয়ে সহায়তা করেন।
পেছনে বসে থাকা আরও দুইজন বিকল্প পাইলট এরপর উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেন। তারা উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের তাবুকের দিকে ঘুরিয়ে দেন। পরে সেখানে নিরাপদে অবতরণ করে ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটি।
সূত্র: এনডিটিভি