ত্রিমুখী টানাপোড়েনে মরক্কোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

মরক্কোর ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফাতিমা জাহরা এল মনসুরিকে নিয়োগ দিয়েছেন দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। তবে এই ঐতিহাসিক রাজকীয় নিয়োগ যেমন দেশটির নারীদের উচ্চ পদে আসীন হওয়ার দীর্ঘদিনের বাধা ভেঙেছে, তেমনি উন্মোচিত করেছে ক্ষমতাধর পদে নারী নেতৃত্ব নিয়ে সমাজে থাকা গভীর দ্বিধা ও রক্ষণশীল মানসিকতা।

গত সেপ্টেম্বরের সংসদীয় নির্বাচনে এল মনসুরির অথেন্টিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি (প্যাম) সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে চার দলীয় জোট গঠন করে। মোট ৩৯৫টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন এখন তাদের দখলে। তবে নিয়োগের পর থেকেই সাবেক ইসলামপন্থি সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী মুস্তফা রামিলসহ অনেকেই ফেসবুকে একটি হাদিস উদ্ধৃত করে কোনও নারী দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে থাকতে পারেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যম শুফ টিভি’র এক জরিপে প্রবীণ মরক্কানদের অনেকেই নারীকে সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নিতে দ্বিধা প্রকাশ করেন। এক বৃদ্ধ বলেন, নারী সরকারপ্রধান হওয়াটা অদ্ভুত লাগছে। এটি আমার কাছে খুব একটা স্বস্তিদায়ক মনে হচ্ছে না। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ শুরু হয়েছে। তবে তরুণ প্রজন্ম ও নারী সমাজ এই নিয়োগকে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছে।

মরক্কোয় নারী অধিকার ও সমতার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা পারিবারিক আইন। যেখানে উত্তরাধিকার, বিয়ে ও তালাকের নিয়ম অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান নিয়মে কন্যাসন্তান ছেলের অর্ধেক সম্পত্তি পায়। দেশটির ধর্মীয় সর্বোচ্চ পরিষদ হাইয়ার কাউন্সিল অব ওলেমা উত্তরাধিকার সমতার দাবির বিরোধিতা করে আসছে। ২০২৫ সালের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির গ্রামীণ এলাকায় ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার মাত্র ৫৫ শতাংশ, যা শহরে ১০০ শতাংশ। শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ার পেছনে নিরাপদ পরিবহনের অভাব, দারিদ্র্য ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সচেতনতার অভাবকে দায়ী করেছেন তরুণীরা।

মরক্কান তরুণী শিফা লাজুজি বলেন, মাসিক স্বাস্থ্যকে এখনও ট্যাবু হিসেবে দেখা হয়... আমি স্কুলে বিনামূল্যে স্যানিটারি পণ্য নিশ্চিত করা দেখতে চাই।

পাঁচ বছর ধরে নগর উন্নয়ন ও আবাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা সাবেক মারাকেচ শহরের মেয়র এল মনসুরি নিজের নিয়োগকে ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, প্রথম নারী সরকারপ্রধান হওয়াটা শুধু আমার জন্য নয়, বরং রাজ্যের সব নারীর জন্য গর্বের।

তবে তিনি পারিবারিক আইন সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত বিশেষ কোনও মন্তব্য করেননি।

যুক্তরাজ্যের এক্সিটার ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. আইরিন ফার্নান্দেজ-মোলিনা বলেন, নির্বাচনে মাত্র ৩৮ শতাংশ ভোট পড়ার প্রেক্ষাপটেই রাজতন্ত্রের নিজের বৈধতা প্রমাণের জন্য এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একে তিনি ‘কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রীয় নারীবাদ’ বলে আখ্যা দেন। অন্যদিকে নারীবাদী কর্মী ইয়াসমিনা বেনস্লিমান বলেন, এটি প্রচলিত ধারণা ভেঙেছে, তবে তিনি কীভাবে সেখানে পৌঁছালেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

মনসুরির বাবা একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কূটনীতিক ছিলেন, যা তাকে সাধারণ নারীদের চেয়ে সুবিধা দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের হাতে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র সংক্রান্ত প্রধান নির্বাহী ক্ষমতা থাকায় এবং ধর্মীয় আলেমদের মুখোমুখি হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় মনসুরির জন্য সংস্কার কাজ চালানো বেশ চ্যালেঞ্জিং। মরোক্কান তরুণী সারা জুয়ীতেন বলেন, আমি মনে করি না মনসুরিকে শুধু নারী হওয়ার কারণে বিচার করা উচিত। ক্ষমতায় থাকা নারী মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নারী অধিকারের রক্ষক নন। তার দল আধুনিকতার কথা বলে, এখন দেখার বিষয় তা বাস্তবে রূপ নেয় কি না।

সূত্র: বিবিসি