শতাব্দীর অন্যতম সংকটময় রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটেন। দেশটির প্রধান দুই দল, লেবার ও কনজারভেটিভ উভয়ই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্ব সংকটে জর্জরিত। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
বর্তমানে লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে। দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। গোর্টন ও ডেন্টন উপ-নির্বাচনকে ঘিরে এই সংঘাত চরমে পৌঁছায়। স্টারমারের সমর্থনে দলের ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটি (এনইসি) গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামকে প্রার্থী হতে বাধা দেয়।
এই সিদ্ধান্তকে দলীয় ও বাইরের মহলে গোষ্ঠীগত রাজনীতি বলে সমালোচনা করা হয়েছে। উত্তর ইংল্যান্ডের এমপি ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা এটিকে স্টারমারের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছেন। সম্প্রতি জরিপ বলছে, বার্নহামকে ঠেকানোর ফলে উল্টো নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে’র জন্য জয় সহজ হয়েছে। ভোটারদের ধারণা, লেবার নেতৃত্ব এখন একটি লন্ডন কেন্দ্রিক কঠোর আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রে পরিণত হয়েছে, যারা নিজেদের যোগ্য নেতাদেরই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।
অন্যদিকে কনজারভেটিভ পার্টি ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়। একের পর এক নেতা পরিবর্তন ও আদর্শিক শূন্যতায় দলটি জনবিচ্ছিন্ন। ২০২৬ সালের জানুয়ারির জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১৯ শতাংশ ভোটার কনজারভেটিভদের সমর্থন করেছেন। বহু এলাকায় তারা তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে। প্রবীণ ভোটারদের ঐতিহ্যগত সমর্থনও ভাঙছে। অর্থনীতি ও জনসেবার অবনতিতে দলটি কার্যকর কোনও দিশা দেখাতে পারছে না।
আবার ডানপন্থি রাজনীতির এই শূন্যস্থান পূরণ করছে ‘রিফর্ম ইউকে’। একসময় প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত দলটি এখন শক্তিশালী পার্লামেন্টারি শক্তিতে রূপ নিয়েছে। রবার্ট জেনরিক, সুয়েলা ব্রাভারম্যান ও নাধিম জাহাউইসহ ২০ জনের বেশি সাবেক কনজারভেটিভ মন্ত্রী ও এমপি দলটিতে যোগ দিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে রিফর্ম ইউকে’র সমর্থন ৩৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা কনজারভেটিভদের পুরনো ঘাঁটি ভেঙে দিয়েছে।
এই সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ফলে দুই-দলীয় ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা ভেঙে পড়েছে। লেবারের প্রতি সাধারণ মানুষের অসন্তোষ এবং কনজারভেটিভদের আদর্শিক বিচ্যুতি ভোটারদের রাজনীতি বিমুখ করেছে। সম্প্রতি স্থানীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নেমে এসেছে প্রায় ৩০ শতাংশে, যা প্রমাণ করে যে মানুষ আর ওয়েস্টমিনস্টারের কথা শুনতে আগ্রহী নয়। এই ঐতিহাসিক শূন্যতা এখন এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যেখানে মানুষ গতানুগতিক ধারার বাইরে বিকল্প কোনও শক্তির সন্ধান করছে।
এই পরিস্থিতি বামপন্থার জন্য সুযোগ তৈরি করলেও জেরেমি করবিন ও জারাহ সুলতানার উদ্যোগ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ২০২৬ সালের জানুয়ারির সম্মেলনের পর পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আর্থিক দ্বন্দ্বে দলটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে । বৃহত্তর জোট গড়ার বদলে বহিষ্কার ও শুদ্ধি অভিযানে ব্যস্ত থাকায় বহু ভোটারের আশা ভেঙেছে।
ব্রিটিশ মুসলিম, দক্ষিণ এশীয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত কমিউনিটিসহ নতুন অভিবাসীরা এই ব্যর্থতাকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রশ্নে লেবারের অবস্থান তাদের হতাশ করেছে। করবিনের বিকল্প কোনো শক্তিশালী নেতৃত্বও গড়ে না উঠায় এই বড় জনগোষ্ঠী এখন তীব্র রাজনৈতিক শূন্যতা অনুভব করেছে। যারা করবিনকে সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার প্রতীক ভাবত, তারা দেখছে এই আন্দোলন মূলত অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে আটকে আছে। ফলে এসব ভোটার এখন আর কোনও নির্দিষ্ট দলের প্রতি অনুগত নয়।
ডানপন্থি রাজনীতির বিপরীতে গ্রিন পার্টি নতুন বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে। বিশেষ করে ৩০ বছরের কম বয়সী ও নগরকেন্দ্রিক পেশাজীবীদের মধ্যে দলটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। অভিবাসী ও তরুণ ভোটারদের কাছে গ্রিন পার্টি পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়, পরিবেশবাদী দলটি কি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পূর্ণাঙ্গ সমাধান দিতে পারবে?
ব্রিটেনের রাজনীতি এখন অনিশ্চিত পথে। কনজারভেটিভদের পতন ও লেবারের ভাঙনে ২০২৬ সালের স্থানীয় নির্বাচন বর্তমান ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা। আগামী লড়াই আর বাম বনাম ডান নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত শক্তি বনাম নতুন বিকল্প। গণমুখী রাজনীতির সুযোগ থাকলেও সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। জনগণের ধৈর্য এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়।