এআইয়ের প্রভাব, ২২০ সাংবাদিক ছাঁটাই করলো মিরর

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক সংবাদ সংক্ষেপণের প্রভাবে ডিজিটাল সংবাদের পাঠক ও ট্রাফিক আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় বড় ধাক্কা খেল যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান রিচ পিএলসি। জাতীয় দৈনিক ডেইলি মিরর, ডেইলি এক্সপ্রেস ও ডেইলি স্টারসহ একাধিক আঞ্চলিক সংবাদপত্রের মূল এই প্রকাশনা সংস্থাটি সম্পাদকীয় বিভাগ থেকে আরও ২২০ জন সংবাদকর্মীকে ছাঁটাই করার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠানটি এ সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করে। পাঠকদের অভ্যাসে যুগান্তকারী পরিবর্তন এবং গুগলসহ বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর স্বয়ংক্রিয় এআই সামারির ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাজ্যের মূলধারার প্রিন্ট ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে।

এআই সামারি ও পাঠ অভ্যাস বদল 

প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় রিচ পিএলসি কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমান ডিজিটাল বাস্তবতায় টিকে থাকার জন্য এ ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাঠকদের তথ্য খোঁজার ধরনে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক সার্চ ইঞ্জিনগুলো সরাসরি ফলাফল পাতায় এআইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন সংক্ষেপে তুলে ধরছে।

এর ফলে পাঠকদের সংবাদপত্রের মূল ওয়েবসাইটে প্রবেশের প্রবণতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে, যাকে প্রযুক্তি বিশ্বে ‘জিরো-ক্লিক’ সংস্কৃতি বলা হচ্ছে। ওয়েবসাইটের ভিজিটর কমে যাওয়ায় প্রদর্শনভিত্তিক ডিজিটাল বিজ্ঞাপন থেকে আয় একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

রিচের এ সাম্প্রতিক কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রভাব পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির অধীনে থাকা জনপ্রিয় আঞ্চলিক দৈনিকগুলোতেও। এর মধ্যে রয়েছে ম্যানচেস্টার ইভিনিং নিউজ, দ্য বার্মিংহাম মেল ও লিভারপুল ইকো। গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক কর্মী ছাঁটাইয়ের পর নতুন করে ২২০ জনের চাকরিচ্যুতি আঞ্চলিক সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সার্বিক মানের ওপর মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। এমনটাই মনে করছে দেশটির সাংবাদিকদের সংগঠন ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস (এনইউজে)।

প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন বা পে-ওয়াল ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা করলেও এর মাধ্যমে বিজ্ঞাপননির্ভর আয়ের ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাগুলোর ভবিষ্যৎ এখন সরাসরি এআই সার্চ অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্ম মনোপলির মুখে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

সংকটের মুখে দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ

যুক্তরাজ্যে সৃষ্ট এই নজিরবিহীন সংকট শুধু পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যমগুলোতেও। বাংলাদেশ ও ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিনের রেফারেল ট্রাফিকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে সংবাদপত্র শিল্প আগে থেকেই বিজ্ঞাপন কমে যাওয়া এবং প্রিন্ট সার্কুলেশন সংকুচিত হওয়ার মতো জটিলতায় ধুঁকছে। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক সার্চ ইঞ্জিন ও স্থানীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ওভারভিউ কিংবা চ্যাটবটের প্রসার সরাসরি ডিজিটাল পোর্টালগুলোর পাঠকদের সাইটবিমুখী করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি জায়ান্টরা যখন সংবাদকর্মীদের মূল তথ্য বা অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন অনুমতি ও ন্যায্য রয়্যালটি ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে পাঠকদের সামনে তুলে ধরে, তখন দীর্ঘমেয়াদে নিরপেক্ষ সংবাদ টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

রিচ পিএলসির এই কর্মী সংকোচনের ঘটনা স্পষ্ট বার্তা দেয়, যুক্তরাজ্য থেকে শুরু করে বাংলাদেশ পর্যন্ত স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্ষা করতে হলে কেবল ভিউ বা ক্লিকের ওপর নির্ভর না করে কনটেন্ট সুরক্ষা আইন, ডেটা লাইসেন্সিং চুক্তি এবং সরাসরি পাঠকনির্ভর টেকসই আর্থিক মডেল গড়ে তোলাই হবে আগামীর একমাত্র পথ।