বিলুপ্তির ঝুঁকিতে অগভীর পানির প্রবাল প্রাচীর

আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বিশ্বের প্রায় সব অগভীর পানির প্রবাল প্রাচীর ধসে পড়ার অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে নতুন এক বৈশ্বিক মূল্যায়নে সতর্ক করেছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিপন্ন বন্যপ্রাণীবিষয়ক বিশ্ব কর্তৃপক্ষ সংস্থাটি পৃথিবীর ৯৬ শতাংশ প্রবাল প্রাচীর ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকির শ্রেণি ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জার্ড বা চরম বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০৭৫ সালের মধ্যে এগুলোর পুরোপুরি বিলুপ্তি ঘটতে পারে।

আইইউসিএন রেড লিস্ট অব কোরাল রিফ ইকোসিস্টেমস মূল্যায়নের বৈজ্ঞানিক প্রধান মিশাল গুদকা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ হুমকি আসন্ন ও গুরুতর, আর তা এসব বাস্তুতন্ত্রের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রবাল তাপের প্রতি সংবেদনশীল এবং মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কাছে বিশেষভাবে ভঙ্গুর। এ পরিবর্তন সাগর উষ্ণ করছে এবং ক্ষতিকর ব্লিচিংয়ের ঘটনার সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়াচ্ছে।

প্রাচীর ধসে পড়লে শক্ত প্রবাল হারিয়ে যায় এবং সেখানে আসে শৈবাল, ভাঙা টুকরা ও স্পঞ্জ। ফলে ক্ষুদ্র অমেরুদণ্ডী প্রাণী থেকে শুরু করে গ্রুপারের মতো প্রবাল মাছ পর্যন্ত যে বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র সেখানে থাকতে পারত, প্রাচীরটি আর তা ধরে রাখতে পারে না।আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ১৭-তে এক সংবাদ সম্মেলনে গুদকা বলেন, এ বছর প্রাকৃতিক উষ্ণতার ঘটনা সুপার এল নিনোর উদ্ভবও প্রবালের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

প্রবাল প্রাচীরের জন্য এটি সর্বশেষ দুঃসংবাদ। সামুদ্রিক খাবার ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এই প্রাচীর প্রায়ই উপকূলীয় ক্ষয় ও ঝড় ঠেকানোর প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। কখনও কখনও সাগরের রেইনফরেস্ট নামে পরিচিত এসব প্রাচীরে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য রয়েছে। এগুলো সামুদ্রিক প্রজাতির এক-চতুর্থাংশ এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ও ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখে।

মূল্যায়ন অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোরাল ট্রায়াঙ্গেল, মেসোআমেরিকান ব্যারিয়ার রিফ সিস্টেম এবং লোহিত সাগরের প্রবাল প্রাচীরসহ বিশ্বের বেশির ভাগ বিখ্যাত প্রাচীর ব্যবস্থা চরম বিপন্ন।

প্রতিবেদনের জন্য আইইউসিএন জাতিসংঘের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মধ্যপন্থি পরিস্থিতি ব্যবহার করেছে, যা ২১০০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লবের আগের তুলনায় ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার পূর্বাভাস দেয়। সংস্থাটির বিশ্লেষণে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬২ বর্গকিলোমিটারজুড়ে ১২৭টি ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় প্রবাল ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হয়েছে।

এক সপ্তাহ আগে নেচার জার্নালে প্রকাশিত আইইউসিএনের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাচীর গঠনকারী প্রবাল প্রজাতির প্রায় ৪৪ শতাংশ বিলুপ্তির বর্ধিত ঝুঁকিতে আছে। এক বছর আগের এক জরিপে দেখা যায়, সাগরের ৮৪ শতাংশ প্রাচীরে ক্ষতিকর ব্লিচিং ছড়িয়েছে, যা নথিভুক্ত ইতিহাসে এ ধরনের সবচেয়ে তীব্র ঘটনা।

সতর্কবার্তা সত্ত্বেও আইইউসিএন বলেছে, বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলের প্রবাল প্রাচীর এখনও হারিয়ে যায়নি। গুদকা বলেন, ধ্বংসাত্মক ব্লিচিংয়ের ঘটনা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ সক্ষমতা দেখিয়েছে প্রবাল প্রাচীর। তিনি আরও বলেন, টিকে থাকা, সহনশীল প্রবাল প্রাচীরের কিছু ছোট ছোট অংশ ভবিষ্যতেও থাকতে পারে, তাই এগুলোকে সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করতে আমাদের নাগালের মধ্যে সবকিছু করতে হবে।

সূত্র: আল জাজিরা