জন্মের আগে ত্রুটি ধরা পড়ায় সায়েদা (ছদ্মনাম) নামের শিশুটিকে পৃথিবীতে আনতে বারণ করেছিলেন কেউ কেউ। জন্মের পর ত্রুটি নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে ‘মেরে ফেলা শ্রেয়’ মনে করা এই শিশুটিকে পৃথিবীর আলো দেখালেন চিকিৎসকরা। সুস্থ করে বাড়ি পাঠিয়েছেন বাবা-মায়ের সঙ্গে। এ কাজটি করেছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু সার্জারি বিভাগের এক দল চিকিৎসক।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,শিশুটি যখন মায়ের পেটে ২২ সপ্তাহ, তখন আল্ট্রাসনোগ্রাম করে দেখা যায়— শিশুটির খাদ্যনালি ও পাকস্থলির পর ক্ষুদ্রান্ত্রের শুরুতে ডিওডেনামে বাধা রয়েছে, ফলে এর পরের অংশে খাবার যাবে না। চিকিৎসা ভাষায় যাকে বলা হয় ডিওডেনাল এটরেসিয়া।
পরিবারের বরাত দিয়ে চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির জন্মগত ক্রটি আছে। তাই তাকে পৃথিবীতে না আনার পরামর্শ দেন অনেকেই। কিন্তু অনাগত শিশুটির বাবা-মা পরামর্শ নিতে গেলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের গাইনি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মুনিরা ফেরদৌসের কাছে। তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালে তাদের রেফার করেন। এরপর ঢামেকের চিকিৎসকরা বাবা-মাকে আশ্বাস দেন— শিশুটি পৃথিবীতে আসলে, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে তাকে সুস্থ করতে পারবেন।
কয়েকদিন আগে এই শিশুকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছেন চিকিৎসকরা। তিন দিন বয়সে তার ওজন ছিল এক দশমিক ৭ কেজি। সে সময় শিশুটিকে অ্যানেস্থেশিয়ার অধ্যাপক ডা. দিলীপ ভৌমিক ও নিওনেটাল সার্জারির সহযোগী অধ্যাপক ডা. জগলুল গাফফার খান জিয়া ও ডা. পার্থ সারথি মজুমদার ‘ডিওডেনামের বাধা’ বাইপাসের অপারেশন করেন। দ্বিতীয় দফায় নবজাতক শিশুর চিকিৎসক ডা. ইশরাত লাকী ও এনআইসিউ কেয়ার টিম এবং শিশু সার্জারির ডা. আহমদ জাহিদ হোসেন সোহেলের ফলোআপ অপারেশন করেন। এর ছয় দিন পর মায়ের বুকের দুধ খায় শিশুটি। তখন বাবামায়ের সঙ্গে তাকে বাড়িতে পাঠানো হয়।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. টাবলু আব্দুল হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ধরনের শিশুকে সবাই পরামর্শ দেয় অ্যাবরশন করে ফেলার। সে জন্য উচিত এসব ক্ষেত্রে শিশু ও নবজাতক সার্জনদের পরামর্শ নেওয়া। শিশুটির ডিওডেনামে বাধা ছিল, যার ফলে তার ওপরের অংশ অনেক ফুলে যায়। বাধা অংশটুকু বাইপাস করে পরের অংশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।’
অধ্যাপক হানিফ বলেন, ‘সার্জারির পর পর তো খেতে পারে না। তাই আমরা ধীরে ধীরে ব্রেস্টফিডিং শুরু করলাম। গত পরশু দিন শনিবার থেকে ব্রেস্ট ফিডিং শুরু হয়েছে। রবিবার (২৮ মে) আমরা ছুটি দিয়ে দিয়েছি। এরকম আরও কিছু জন্মগত ক্রটির বাচ্চা মায়ের পেটে থাকাকালীন সময় থেকে আমরা ফলোআপ করি। কিছু ক্ষেত্রে জন্মের পর আমরা স্বাভাবিকও পাই। আবার কিছু ক্ষেত্রে ফলোআপে থাকে, আর কিছু অপারেশন করলে ভালো হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাচ্চা না হওয়ার জন্য বন্ধ্যাত্ব একটা আলাদা বিষয় হিসেবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত এবং চিকিৎসায় লাখ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। সেখানে অবশ্যই মায়ের পেটের কোনও বাচ্চা মেরে ফেলবেন না, বরং শিশু সার্জনদের মতামত নেবেন। জটিল কার্ডিয়াক সমস্যা ছাড়া বেশিরভাগ জন্মগত ত্রুটি অপারেশনের মাধ্যমে ভালো করা সম্ভব। আর যেসব বাচ্চার বেশি জটিলতা থাকে, তা আগেই অ্যাবরশন হয়ে যায়।’