ওভেরিয়ান ক্যানসার: বাংলাদেশের নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট 

বাংলাদেশে নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে এখনও এক ধরনের অদৃশ্য সংকোচ কাজ করে। শরীরের পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের ব্যথা কিংবা প্রজননস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা অনেক পরিবারেই অস্বস্তিকর বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এই সামাজিক নীরবতার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন ওভেরিয়ান ক্যানসারে আক্রান্ত নারীরা, যারা প্রায়শই দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণে জীবন হারাচ্ছেন।

বাংলাদেশে ক্যানসারের সামগ্রিক পরিস্থিতিও দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরি২০২২)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয় এবং ক্যানসারজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি। নারীদের ক্ষেত্রে ওভেরিয়ান ক্যানসার সবচেয়ে প্রাণঘাতী স্ত্রীরোগজনিত ক্যানসারগুলোর একটি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই রোগ নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত সচেতনতা, গবেষণা কিংবা নীতিগত অগ্রাধিকার গড়ে ওঠেনি।

ওভেরিয়ান ক্যানসারকে প্রায়ই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ এর লক্ষণগুলো সাধারণত ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ শারীরিক সমস্যার সঙ্গে মিশে যায়। দীর্ঘদিনের পেট ফাঁপা, তলপেটে অস্বস্তি, ক্ষুধামন্দা, হজমের সমস্যা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তিকে অনেক নারী গ্যাস্ট্রিক বা স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন ভেবে অবহেলা করেন। পরিবার থেকেও প্রায়ই বলা হয়—“এগুলো স্বাভাবিক”, “মেয়েদের এমন হয়”, কিংবা “ডাক্তার দেখানোর দরকার নেই।” ফলে রোগ শনাক্তের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়।

গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও জটিল। বহু নারী নিজের স্বাস্থ্যের চেয়ে সংসার, সন্তান এবং পরিবারের দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেন। নিজের শারীরিক সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া কিংবা তা নিয়ে কথা বলাকে অনেকেই সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর মনে করেন। এই সংস্কৃতি নারীদের চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে দীর্ঘদিন পিছিয়ে দেয়।

এই সংকট কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু। The Lancet Global Health-এ প্রকাশিত ‘‘Experiences of Women with Ovarian Cancer in 22 Low- and Middle-Income Countries (Every Woman Study LMICs)’’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে— নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর নারীরা সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তা পেতে নানা বাধার সম্মুখীন হন। বিশ্ব ওভেরিয়ানক্যানসার কোয়ালিশনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণার বাস্তবতা বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তথ্যের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক ট্যাবু, আর্থিক সংকট এবং নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিনের নীরবতা মিলিয়ে ওভেরিয়ান ক্যানসার অনেক সময় অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়।

বাংলাদেশে ক্যানসার মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়নে—হাসপাতাল বৃদ্ধি, রেডিওথেরাপি সুবিধা সম্প্রসারণ এবং কেমোথেরাপি সেবার বিস্তারে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু নারীরা যদি প্রাথমিক উপসর্গ নিয়েই কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন, তাহলে কেবল চিকিৎসা সুবিধা বাড়িয়ে এই সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় ঘাটতি এখন সচেতনতার জায়গায়।

জাতীয় পর্যায়ে ওভেরিয়ান ক্যানসার সচেতনতা কার্যক্রম জরুরি হয়ে পড়েছে। নারীদের বোঝাতে হবে যে, নিজের শরীরের পরিবর্তন নিয়ে কথা বলা কোনও লজ্জার বিষয় নয়। দীর্ঘদিনের তলপেটের ব্যথা, অস্বাভাবিক ফোলাভাব বা হজমজনিত সমস্যা অবহেলা করা বিপজ্জনক হতে পারে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ক্লিনিক, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব— সবাইকে এই সচেতনতা তৈরির অংশ হতে হবে।

বাংলায় সহজ ভাষায় জাতীয় প্রচারণা চালানো দরকার, যাতে নারীরা ওভেরিয়ান ক্যানসারের উপসর্গগুলো দ্রুত চিনতে পারেন এবং চিকিৎসকের কাছে যেতে উৎসাহিত হন। একইসঙ্গে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে ওভেরিয়ান ক্যানসারকে নারীর স্বাস্থ্য অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

বাংলাদেশ অতীতে টিকাদান কর্মসূচি ও মাতৃস্বাস্থ্য সচেতনতায় যেভাবে সফলতা অর্জন করেছে, ঠিক একইভাবে নারীদের ক্যানসার সচেতনতায়ও একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব।

কারণ ওভেরিয়ান ক্যানসারে অনেক নারী শুধু রোগের কারণে মারা যান না, তারা মারা যান দেরিতে কথা বলার কারণে, সামাজিক নীরবতার কারণে, এবং এমন একটি সংস্কৃতির কারণে যেখানে নারীর কষ্টকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া হয়।

ওভেরিয়ান ক্যানসার নিয়ে নীরবতা ভাঙা এখন শুধু স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন নয়— এটি নারীর অধিকার, মর্যাদা এবং বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

লেখক: পরিচালক, বিশ্ব ওভেরিয়ানক্যানসার কোয়ালিশন