চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র, এক পদে আবেদন গড়ে ২৮৭ জনের

দেশের চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। বর্তমানে অনলাইন চাকরির পোর্টালগুলোতে প্রকাশিত প্রতি একটি পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জন চাকরিপ্রার্থী আবেদন করছেন। অথচ কোভিড-১৯ মহামারির আগের পাঁচ বছরে প্রতি পদের বিপরীতে গড়ে আবেদনকারী ছিলেন ১৭৩ জন। অর্থাৎ করোনা-পরবর্তী সময়ে চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতা প্রায় ৬৬ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে বিআইডিএস আয়োজিত ‘কঠিন সময়ে শ্রমবাজার এবং সামগ্রিক ধাক্কা: বৃহত্তম অনলাইন চাকরির পোর্টালের তথ্যপ্রমাণ’ শীর্ষক সেমিনারে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানী।

তিনি জানান, দেশের বৃহত্তম অনলাইন চাকরির পোর্টালের ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির সময় লকডাউনের কারণে দেশের শ্রমবাজার সবচেয়ে বড় ধাক্কার মুখে পড়ে। সে সময় চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রায় ৭০ শতাংশ এবং চাকরির আবেদন ৫৯ শতাংশ কমে যায়। তবে শ্রমবাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে প্রায় সাড়ে নয় মাস সময় লাগে। যদিও মহামারির প্রভাব কমে যাওয়ার পরও চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং বর্তমানে তা রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে।

অতনু রব্বানী বলেন, বর্তমানে দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে। আনুষ্ঠানিক খাতের চাকরির একটি ছোট অংশ, প্রায় আড়াই থেকে ৩ শতাংশ, অনলাইন চাকরির পোর্টালের মাধ্যমে নিয়োগ হয়। এই অংশ তুলনামূলক ছোট হলেও অনলাইন চাকরির তথ্য শ্রমবাজারের পরিবর্তনের দ্রুত সংকেত দেয়, যা নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি জানান, গত ১০ বছরে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১ হাজার ১৫৪টি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। এসব বিজ্ঞপ্তিতে গড়ে ৩ হাজার ৬৪৬টি পদে নিয়োগের সুযোগ ছিল। বিপরীতে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৬ লাখ ৯৭ হাজার চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেছেন। অধিকাংশ নিয়োগই কর্মজীবনের প্রাথমিক পর্যায়ের পদে হলেও উচ্চপর্যায়ের পদে সরাসরি নিয়োগের প্রবণতা বেশি। এছাড়া ৫৪ শতাংশ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নারী বা পুরুষ—কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ উল্লেখ করা হয় না।

অতনু রব্বানী বলেন, গত এক দশকে মুদ্রানীতির মাধ্যমে শ্রমবাজারে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হয়নি। শুধু ঋণসুবিধা বাড়িয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সম্ভব নয়। নতুন বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি এখনও সীমিত। ফলে বিদ্যমান পদে নিয়োগ কম হচ্ছে, বেকারত্বের চাপ বাড়ছে এবং চাকরি পেতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। তিনি বলেন, উৎপাদনমুখী ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার বিনিয়োগের ক্ষেত্র বৈচিত্র্যময় করার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্তত ১০টি নতুন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সভাপতির বক্তব্যে বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা সংকট বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টেও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। যদিও ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবু কোভিড-পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন অর্থনৈতিক চাপের কারণে দেশের শ্রমবাজার এখনও কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।