পডকাস্ট এখন আর শুধু অডিও শোনার মাধ্যম নয়। ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও পডকাস্টের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। ফলে এই কনটেন্ট তৈরির পেছনে প্রয়োজন হচ্ছে এমন দক্ষ পেশাজীবীর, যিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রযোজনার কাজটি সামলাতে পারেন। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে পডকাস্ট প্রডিউসার হিসেবে নতুন ক্যারিয়ারের সুযোগ।
একটি পডকাস্ট তৈরির কাজ শুধু মাইক্রোফোনের সামনে বসে কথা বলা নয়। বিষয় নির্বাচন, গবেষণা, অতিথি বাছাই, প্রশ্ন তৈরি, শুটিংয়ের প্রস্তুতি, ক্যামেরা ও আলো ব্যবস্থাপনা, শব্দ ধারণ, ভিডিও সম্পাদনা এবং প্রকাশের পর প্রচারণা সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয় একজন প্রডিউসারকে।
কী করেন একজন পডকাস্ট প্রডিউসার?
একজন পডকাস্ট প্রডিউসারের প্রধান দায়িত্ব হলো একটি অনুষ্ঠানের পুরো প্রযোজনা প্রক্রিয়া পরিকল্পনা ও পরিচালনা করা। প্রথমেই তাকে ঠিক করতে হয় পডকাস্টের বিষয় ও ধরন। এটি হতে পারে সংবাদ, শিক্ষা, বিনোদন, প্রযুক্তি, ক্যারিয়ার, খেলাধুলা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনা।
এরপর প্রয়োজন হয় বিষয়টি নিয়ে গবেষণার। আলোচনার বিষয় অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ, অতিথি নির্বাচন এবং সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন তৈরির কাজও করতে হয়। বিশেষ করে তথ্যভিত্তিক পডকাস্টের ক্ষেত্রে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ভিডিও পডকাস্টের ক্ষেত্রে দায়িত্ব আরও বিস্তৃত। ক্যামেরার অবস্থান, ফ্রেম, আলো, ব্যাকগ্রাউন্ড এবং শব্দের মান ঠিক আছে কি না, সেদিকেও নজর রাখতে হয়। বড় প্রযোজনায় এসব কাজের জন্য আলাদা দল থাকলেও পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করেন প্রডিউসার।
সম্পাদনাও জানতে হবে
পডকাস্ট রেকর্ড করার পর শুরু হয় সম্পাদনার কাজ। অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া, কথোপকথন গুছিয়ে নেওয়া, শব্দের মান ঠিক করা এবং ভিডিও পডকাস্ট হলে বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজ সমন্বয় করতে হয়।
এ ছাড়া দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রাফিকস, ছবি, উপযুক্ত কাট ও অন্যান্য ভিজ্যুয়াল উপাদান যুক্ত করা হয়। পডকাস্টের ছোট অংশ কেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য আলাদা ভিডিও তৈরি করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ।
তাই একজন পডকাস্ট প্রডিউসারের জন্য ভিডিও সম্পাদনা, শব্দ সম্পাদনা এবং সাধারণ গ্রাফিকস তৈরির দক্ষতা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
কী কী দক্ষতা প্রয়োজন?
এই পেশায় আসতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গল্প বলার দক্ষতা, গবেষণার অভ্যাস এবং প্রযোজনার পরিকল্পনা করার সক্ষমতা। পাশাপাশি ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, আলো ও ভিডিও সম্পাদনার মৌলিক ধারণা থাকা দরকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পর্কে ভালো ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ভালো পডকাস্ট তৈরি করার পাশাপাশি সেটি কীভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছানো যায়, সেটিও প্রডিউসারের দায়িত্বের অংশ হতে পারে।
ইউটিউবের ভিডিও শিরোনাম, থাম্বনেইল, বিবরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং দর্শকের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ এসব বিষয়ে ধারণা থাকলে ক্যারিয়ারে এগিয়ে থাকা সম্ভব।
কারা এই পেশায় আসতে পারেন?
গণযোগাযোগ, সাংবাদিকতা, মিডিয়া স্টাডিজ, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন, মার্কেটিং কিংবা যোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য এই পেশা বেশ উপযোগী। তবে নির্দিষ্ট বিষয়ে ডিগ্রি না থাকলেও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকলে এই পেশায় আসার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে যারা ভিডিও নির্মাণ, সাংবাদিকতা, উপস্থাপনা, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, স্ক্রিপ্ট লেখা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরিতে আগ্রহী, তাদের জন্য পডকাস্ট প্রযোজনা হতে পারে সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র।
কীভাবে শুরু করবেন?
শুরুতেই বড় কোনো স্টুডিও বা প্রতিষ্ঠানে কাজ পাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে নিজের একটি ছোট পডকাস্ট দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। একটি নির্দিষ্ট বিষয় বেছে নিয়ে নিয়মিত পর্ব তৈরি করলে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা তৈরি হবে।
প্রথমদিকে মোবাইল ফোন, সাধারণ মাইক্রোফোন ও সহজ ভিডিও সম্পাদনা সফটওয়্যার ব্যবহার করেই কাজ শুরু করা সম্ভব। ধীরে ধীরে ক্যামেরা পরিচালনা, আলো, শব্দ, সম্পাদনা ও কনটেন্ট পরিকল্পনার দক্ষতা বাড়ানো যেতে পারে।
নিজের তৈরি কাজগুলো নিয়ে একটি পোর্টফোলিও তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। চাকরি বা ফ্রিল্যান্স কাজের ক্ষেত্রে একটি ভালো পোর্টফোলিও অনেক সময় শুধু সনদের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।
পডকাস্টের পরিধি অডিও থেকে ভিডিওতে বিস্তৃত হওয়ায় এই খাতে কাজের ধরনও বদলাচ্ছে। ফলে যারা সাংবাদিকতা, ভিডিও নির্মাণ ও ডিজিটাল কনটেন্ট এই তিনটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে চান, তাদের জন্য পডকাস্ট প্রডিউসার হতে পারে ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার।