কক্সবাজারে রোমাঞ্চের আড়ালে মৃত্যুফাঁদ, এবার আরেক পর্যটকের মৃত্যু

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের দরিয়ানগর এলাকায় ‘সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’ পয়েন্টে প্যারাসেইলিং করার সময় আকাশ থেকে ছিটকে পানিতে পড়ে শৌভিক রায় (৩০) নামের এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শৌভিক রায় খুলনা সিটি করপোরেশনের বানিয়াখামার এলাকার স্যার ইকবাল সড়কের বাসিন্দা শেখর রায়ের ছেলে। তিনি নয় সদস্যের একটি পর্যটক দলের সঙ্গে কক্সবাজার ভ্রমণে এসেছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্যারাসেইলিং চলাকালে হঠাৎ তিনি নিরাপত্তা সরঞ্জাম থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং কর্তৃপক্ষ তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় নিহতের সহযাত্রী, স্বজন ও সফরসঙ্গীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেলিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ এক যুগ ধরে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করে আসছে। প্রায় সময় প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে পড়ে পর্যটক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় প্রশাসন প্যারাসেইলিংয়ে নিষেধাজ্ঞা দিলেও প্রতিষ্ঠানটি এটি চালু রেখেছিল। 

এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করেও ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেলিং প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শহরের বাহারছড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ফরিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে প্যারাসেইলিং কার্যক্রম পরিচালিত হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অতীতেও একই প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেলিং কার্যক্রমে দুর্ঘটনার ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনায় আসে। তবে এসব ঘটনার পরও নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘দরিয়ানগর এলাকায় প্যারাসেইলিং করার সময় সমুদ্রে পড়ে ওই পর্যটক গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মোহাম্মদ সহেল বলেন, ‘বেলা ২টা ১০ মিনিটে শৌভিককে হাসপাতালে আনা হয়। এখানে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্রে পড়ে যাওয়ার কারণেই মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যাবে।’

পর্যটকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং পরিচালিত হলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর কোনও নজরদারি নেই। একের পর এক দুর্ঘটনার পরও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনও ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।

গত বছরের ৩০ আগস্ট দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে এক পর্যটক ঝাউগাছের ডগায় আটকে দীর্ঘ সময় ঝুলে ছিলেন। পরে তাকে উদ্ধার করা হলেও সে ঘটনার পরদিন জেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে সব ধরনের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল।

২০২৫ সালের ২০ মে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিংয়ের সময় এক পর্যটক দম্পতি সমুদ্রে ছিটকে পড়ে আহত হন। সে সময় প্রশাসনের দাবি ছিল, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে নিয়ম ভেঙে একসঙ্গে দুজনকে নিয়ে উড্ডয়ন করানো হয়েছিল। ওই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরঞ্জাম জব্দ করে কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

একই বছরের আরেক ঘটনায় এক নারী পর্যটক প্যারাসেইলিং চলাকালে সমুদ্রে পড়ে আহত হন। তখনও জেলা প্রশাসন নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। প্রশাসনের ভাষ্য ছিল, নিরাপত্তা বিধি না মেনে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করা হচ্ছিল।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত অপারেটর, নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা, কার্যকর মনিটরিং এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা আরও ঘটতে পারে। নিরাপত্তা মান যাচাই না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রেখে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত।’