পাশাপাশি দুই দ্বীপ, অথচ একটিতে আজ আর অন্যটিতে আগামীকাল!

ভাবুন, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন একটি দ্বীপে। চোখের সামনে আরেকটি দ্বীপ, দূরত্ব মাত্র কয়েক কিলোমিটার। অথচ আপনি যে দিনটিতে আছেন, অন্য দ্বীপের মানুষ তখন যেন তার পরের দিনেই পৌঁছে গেছে!

শুনতে কল্পকাহিনির মতো হলেও এমনই এক বিস্ময়কর বাস্তবতা রয়েছে বেরিং প্রণালীর দুই দ্বীপে।

রাশিয়ার বিগ ডায়োমিড ও যুক্তরাষ্ট্রের লিটল ডায়োমিড বেরিং প্রণালির মাঝে অবস্থিত পাশাপাশি দুটি দ্বীপ। সবচেয়ে কাছের জায়গায় দ্বীপ দুটির দূরত্ব মাত্র প্রায় ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার। মাঝখানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার আন্তর্জাতিক সীমান্ত। তবে এই সীমান্তের বিশেষত্ব আরও বিস্ময়কর। দুই দ্বীপের মাঝ দিয়েই গেছে পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাল্পনিক রেখা আন্তর্জাতিক তারিখরেখা।

একই আকাশের নিচে, প্রায় পাশাপাশি অবস্থান করেও দুটি দ্বীপ যেন দুই ভিন্ন দিনের বাসিন্দা। বিগ ডায়োমিড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে, আর লিটল ডায়োমিড যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের অংশ। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপ খালি চোখেই দেখা যায়। কিন্তু সময়ের হিসাবে তাদের অবস্থান প্রায় এক দিনের ব্যবধানে।

এই অদ্ভুত ভৌগোলিক বৈপরীত্যের কারণ আন্তর্জাতিক তারিখরেখা। এই কাল্পনিক রেখা অতিক্রম করলে ক্যালেন্ডারের তারিখ এক দিন এগিয়ে বা পিছিয়ে যায়। ফলে লিটল ডায়োমিডে যখন সোমবার সকাল, বিগ ডায়োমিডে তখন মঙ্গলবারের সময় হতে পারে। এ কারণেই বিগ ডায়োমিড পরিচিত ‘আগামীকালের দ্বীপ’, আর লিটল ডায়োমিড ‘গতকালের দ্বীপ’ নামে। নাসাও দুটি দ্বীপকে ‘গতকাল ও আগামীকালের দ্বীপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

দুটি দ্বীপের স্থানীয় সময়ের ব্যবধান ঋতুভেদে প্রায় ২০ থেকে ২১ ঘণ্টা। অর্থাৎ কয়েক কিলোমিটার সমুদ্রপথ পেরোলেই ঘড়ির সময় প্রায় এক দিনের কাছাকাছি এগিয়ে বা পিছিয়ে যেতে পারে।

তাই লিটল ডায়োমিড থেকে বিগ ডায়োমিডের দিকে তাকানোকে মজার অর্থে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর সঙ্গে তুলনা করা হয়। আবার উল্টো দিক থেকে দেখলে যেন তাকানো হচ্ছে গতকালের দিকে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে দুটি দ্বীপে সূর্য ভিন্ন গতিতে চলে কিংবা সেখানে পৃথিবীর ঘূর্ণন আলাদা। আসল বিষয় হলো সময় অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক তারিখরেখা। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় সময় নির্ধারণ করা হয় সময় অঞ্চলের মাধ্যমে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক তারিখরেখা পৃথিবীর ক্যালেন্ডারে তারিখ পরিবর্তনের একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কাল্পনিক সীমা।

ডায়োমিড দ্বীপপুঞ্জের ক্ষেত্রে এই দুই ব্যবস্থার মিলনই তৈরি করেছে এমন এক বিস্ময়কর সময়-ভৌগোলিক পরিস্থিতি।

উপগ্রহের ছবিতে দেখা যায়, বিগ ডায়োমিড ও লিটল ডায়োমিডের মাঝ দিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সীমান্তই নয়, আন্তর্জাতিক তারিখরেখাও চলে গেছে।

ফলে একই সমুদ্রের মাঝে পাশাপাশি থাকা দুটি দ্বীপের পরিচয় দাঁড়িয়েছে একেবারেই ভিন্নভাবে। একদিকে রাশিয়ার বিগ ডায়োমিড—আগামীকাল, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লিটল ডায়োমিড—গতকাল।

মাত্র কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে এমন সময়ের পার্থক্য পৃথিবীর ভূগোলকে করে তুলেছে আরও বিস্ময়কর। একই আকাশ, একই সমুদ্র, পাশাপাশি দুটি দ্বীপ। তবু ক্যালেন্ডারের পাতায় তারা যেন দাঁড়িয়ে আছে দুই ভিন্ন দিনে।

ডায়োমিড দ্বীপপুঞ্জ তাই শুধু দুই দেশের সীমান্তের একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি দেখিয়ে দেয়, পৃথিবীর মানচিত্র কখনো কখনো শুধু কোথায় আমরা আছি তা নয়, কোন দিনে আমরা আছি—সেটিও নির্ধারণ করে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: নাসা আর্থ অবজারভেটরি ও নাসা/জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি।