সুইজারল্যান্ড বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আল্পসের তুষারঢাকা পাহাড়, সবুজ উপত্যকা আর ছবির মতো গ্রাম। কিন্তু দেশটির আরেকটি সৌন্দর্য এখনও অনেক পর্যটকের নজরের বাইরে জুরা ও থ্রি লেকস অঞ্চল। ফ্রান্সের সীমান্তঘেঁষা এই শান্ত জনপদে পাহাড়ের বদলে হ্রদ, নৌভ্রমণ, স্থানীয় খাবার ও ওয়াইনের মিশেলে মিলতে পারে এক ভিন্ন ধরনের সুইস অভিজ্ঞতা।
এই অঞ্চলের সৌন্দর্য আবিষ্কারের সবচেয়ে ভালো উপায়গুলোর একটি হতে পারে এক হ্রদ থেকে আরেক হ্রদে ফেরিতে ঘুরে বেড়ানো।
যাত্রার শুরু লেক বিয়েল থেকে। ফেরি যখন নীল পানির বুক চিরে এগিয়ে যায়, পেছনে তৈরি হয় কোমল ঢেউ দূর থেকে মনে হয় নীল ক্যানভাসের ওপর কেউ তুলির আঁচড় টেনে দিচ্ছে।
ডান দিকে দেখা যায় শান্ত পাহাড়, বাম পাশে সোনালি রঙের বিস্তীর্ণ মাঠ। সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে সেন্ট পিটার্স আইল্যান্ড। দূর থেকে দ্বীপটিকে এতটাই নির্জন মনে হয় যে মনে হতে পারে, কোনো এক নির্জন দ্বীপে রবিনসন ক্রুসোর মতো জীবন কাটানো যায় এখানে।
দ্বীপের ঘাটে অপেক্ষা করছিলেন স্থানীয় নৌকার মাঝি, ইতিহাসবিদ ও গাইড ম্যাক্স ফ্রে। এই অঞ্চলের ইতিহাস ও মানুষের জীবন সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা যেন নৌভ্রমণের সঙ্গে যোগ করে দেয় আরেকটি মাত্রা।
ফ্রান্সের সীমান্তের কাছে অবস্থিত জুরা ও থ্রি লেকস অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই সুইজারল্যান্ডের তুলনামূলক কম পরিচিত পর্যটন এলাকা। দেশের জনপ্রিয় পাহাড়ি গন্তব্যগুলোর তুলনায় এখানে পর্যটকের ভিড় অনেক কম।
তবে সেই ‘কম পরিচিতি’ই যেন এই অঞ্চলের সৌন্দর্যের একটি বড় অংশ। এখানে নেই সুইস আল্পসের মতো বিশাল তুষারশৃঙ্গের আধিপত্য। তার বদলে রয়েছে শান্ত হ্রদ, ঢেউখেলানো পাহাড়, কৃষিজমি, ছোট ছোট জনপদ এবং জলপথে ধীরে ভেসে চলার সুযোগ।
একদিনে একাধিক হ্রদ ঘুরে দেখার এই ‘লেক-হপিং’ অভিজ্ঞতা হতে পারে তাঁদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়, যাঁরা সুইজারল্যান্ডকে একটু অন্যভাবে দেখতে চান।
ফেরির জানালার বাইরে বদলে যেতে থাকে দৃশ্য। কোথাও পাহাড় নেমে এসেছে হ্রদের কিনারে, কোথাও সবুজের মাঝে ছড়িয়ে আছে কৃষিজমি। আবার কোথাও ছোট্ট ঘাটে ফেরি থামলে মনে হয়, ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্র থেকে বহু দূরে কোনো স্থানীয় জনপদে এসে পৌঁছেছি।
জুরা ও থ্রি লেকস অঞ্চলে ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর জলভিত্তিক যাত্রাপথ। হ্রদগুলোকে কেন্দ্র করে ফেরি চলাচল করায় গাড়িতে দীর্ঘ পথ পাড়ি না দিয়েও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছানো যায়।
ফেরির ডেকে বসে ভ্রমণের সময় তাই আলাদা কোনো বিনোদনের প্রয়োজন হয় না। চারপাশের দৃশ্যই হয়ে ওঠে ভ্রমণের মূল আকর্ষণ।
কখনও সামনে দেখা যায় পাহাড়ের সারি, কখনও আঙুরের বাগান, আবার কখনও হ্রদের ধারে ছোট্ট কোনো গ্রাম। পানির ওপর দিয়ে চলার কারণে একই দৃশ্যও বারবার বদলে যায়—কখনও কাছ থেকে, কখনও অনেক দূর থেকে।
প্রকৃতির পাশাপাশি এই অঞ্চলের আরেকটি আকর্ষণ স্থানীয় খাবার ও ওয়াইন। জুরা ও থ্রি লেকস অঞ্চলের গ্রাম ও ছোট শহরগুলোতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাবারের সঙ্গে আঞ্চলিক ওয়াইনের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে হ্রদের আশপাশের আঙুর চাষের এলাকা ও স্থানীয় খাবারের ঐতিহ্য এই ভ্রমণকে শুধু দৃশ্যনির্ভর রাখে না, বরং খাবারের স্বাদেও পরিপূর্ণ করে। ফেরিতে কাটানো একটি সকাল কিংবা দুপুর তাই শেষ হতে পারে কোনও শান্ত লেকসাইড শহরে নেমে স্থানীয় খাবার আর ওয়াইনের স্বাদ নেওয়ার মধ্য দিয়ে।
যারা প্রথমবার সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছেন, তাদের কাছে আল্পস, জুরিখ, জেনেভা বা লুসার্ন হয়তো স্বাভাবিক পছন্দ। কিন্তু দ্বিতীয়বারের ভ্রমণে কিংবা ভিড় এড়িয়ে একটু ধীরগতির অবকাশ চাইলে জুরা ও থ্রি লেকস অঞ্চল হতে পারে আকর্ষণীয় বিকল্প।
এখানে ভ্রমণের মূল বিষয় কোনো একটি দর্শনীয় স্থান নয়। বরং ফেরিতে চড়া, হ্রদের ওপর দিয়ে ধীরে এগিয়ে চলা, পাহাড় ও মাঠের দৃশ্য দেখা, ছোট দ্বীপে নামা, স্থানীয় খাবার খাওয়া এবং ওয়াইনের স্বাদ নেওয়া সব মিলিয়ে তৈরি হয় একটি শান্ত ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।
সুইজারল্যান্ডের যে রূপটি বরফঢাকা পাহাড়ের পোস্টকার্ডে খুব একটা দেখা যায় না, জুরা ও থ্রি লেকস যেন সেই নরম, শান্ত ও ধীরগতির সুইজারল্যান্ডেরই গল্প বলে।
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান









