হ্রদের দেশে ‘হিটেড রাইভ্যালরি’র কটেজের খোঁজে

জনপ্রিয় সিরিজ হিটেড রাইভ্যালরি’র সেই নির্জন কটেজ দেখতে যেতে পারেন। তবে সেখানে পৌঁছে হয়তো বুঝবেন কটেজটি আসলে এই ভ্রমণের একমাত্র আকর্ষণ নয়। চারপাশের হ্রদ, পাথুরে তটরেখা, বনভূমি, ছোট শহরের শান্ত জীবন আর প্রকৃতির নানা আয়োজন আপনাকে আরও কিছুদিন থেকে যেতে বাধ্য করতে পারে।

পর্দায় কটেজটি ক্যুবেকে অবস্থিত বলে দেখানো হলেও বাস্তবে সেটি প্রায় ৩৮৫ মাইল পশ্চিমে, কানাডার অন্টারিওর মাসকোকা অঞ্চলে। একই নামের হ্রদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই এলাকা কানাডার অভিজাত অবকাশযাপনের অন্যতম ঠিকানা। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের হ্যাম্পটনসের সঙ্গেও তুলনা করেন।

মাসকোকায় ছোট কাঠের কুটির থেকে শুরু করে কোটি ডলারের বিলাসবহুল লেক হাউস সবকিছুকেই স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘কটেজ’। আর এই কটেজ-সংস্কৃতিই অঞ্চলটির জীবনযাত্রার অন্যতম পরিচয়।

কটেজের বাইরেও যে অনেক কিছু

সপ্তাহান্তে মাসকোকায় ঘুরতে গেলে খরচ বেশ চড়া হতে পারে। তবে মজার বিষয় হলো, সেখানে উপভোগ করার মতো অনেক অভিজ্ঞতার জন্য আলাদা কোনো খরচই লাগে না।

হ্রদের ধারে হাঁটা, মনোরম ট্রেইলে হাইকিং, সূর্যাস্ত দেখা কিংবা প্রকৃতির মধ্যে পাখি খোঁজা সবই করা যায় বিনা খরচে। আর একটু রোমাঞ্চ চাইলে রয়েছে নৌভ্রমণ, কায়াকিং, ওয়াটার-স্কিইং ও নানা ধরনের জলক্রীড়া।

তবে প্রকৃতির এই আনন্দ উপভোগের জন্য আবহাওয়ার সহায়তাও দরকার। জুনের শেষ দিকে ভ্রমণের সময় আকাশ ছিল পরিষ্কার, বাতাসে ছিল শীতলতা। কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি অন্টারিও ও মিনেসোটার দাবানলের ধোঁয়া আকাশ ঢেকে দিয়েছিল। ফলে মাসকোকায় যাওয়ার আগে আবহাওয়া ও বায়ুর মানের পূর্বাভাস দেখে নেওয়াই ভালো।

ধনীদের পুরোনো অবকাশভূমি

পাথুরে তটরেখা আর ১ হাজার ৬০০টির বেশি হ্রদ নিয়ে মাসকোকা দীর্ঘদিন ধরেই ধনী কানাডীয়দের প্রিয় অবকাশকেন্দ্র।

তবে ১৯৪০-এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৫০-এর দশকে গাড়ির ব্যবহার এবং মহাসড়কের বিস্তারের ফলে এই অঞ্চলে মধ্যবিত্ত পর্যটকদের আনাগোনাও বাড়ে। পরে ১৯৮০-এর দশকের করব্যবস্থার পরিবর্তন এবং প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার প্রতি নতুন করে আগ্রহ মাসকোকাকে আবারও অভিজাতদের পছন্দের ঠিকানায় পরিণত করে।

এখন এখানকার সম্পত্তির দাম আকাশছোঁয়া। তিনটি প্রধান হ্রদের তীরবর্তী বাড়ির গড় মূল্য প্রায় ৪০ লাখ কানাডীয় ডলার। মাসকোকায় সম্পত্তি রয়েছে মার্টিন শর্ট, স্টিভেন স্পিলবার্গ, টম হ্যাঙ্কস ও সিন্ডি ক্রফোর্ডের মতো তারকাদেরও।

পর্দার সেই কটেজ

‘হিটেড রাইভ্যালরি’র বহুল আলোচিত কটেজটি তৈরি হয়েছে ২০২০ সালে। দুই তলা, তিন শোবার ঘরের বাড়িটিতে রয়েছে কাচের দেয়াল, মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত জানালা এবং মাঝখানে বিশাল গ্রানাইটের অগ্নিকুণ্ড।

গাছপালায় ঘেরা ব্যক্তিগত পথ দিয়ে পৌঁছাতে হয় বাড়িটিতে। সামনে রয়েছে প্রায় ৪০০ ফুট দীর্ঘ জলতীর।

কটেজটিতে থাকার সুযোগ না হলেও দূর থেকে দেখলেই বোঝা যায়, কেন সিরিজের চরিত্র শেন হল্যান্ডার ও ইলিয়া রোজানভের জন্য জায়গাটি এতটা উপযুক্ত মনে হয়েছিল। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, সামনে বিশাল হ্রদ আর চারপাশে বন—নিজেদের মতো করে থাকার জন্য এর চেয়ে ভালো আশ্রয় আর কী হতে পারে!

যাঁরা এই কটেজেই থাকতে চান, তাঁদের অবশ্য বড় বাজেট রাখতে হবে। সাম্প্রতিক ভাড়া শুরু হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০ কানাডীয় ডলার থেকে, সঙ্গে রয়েছে অন্তত তিন রাত থাকার শর্ত।

গ্র্যাভেনহার্স্টে হ্রদপাড়ের জীবন

নিজের থাকার জন্য গ্র্যাভেনহার্স্ট শহরের একটি হোটেল বেছে নেওয়া যায়। ঐতিহাসিক এই শহর একসময় কাঠ ও স্টিমশিপের জন্য পরিচিত ছিল; এখন গ্রীষ্মের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র।

শহরে থাকার বড় সুবিধা হলো হ্রদপাড়ের অনেক আকর্ষণ হেঁটেই দেখা যায়।

পেনিসুলা ট্রেইল শুরু হয়েছে হোটেল এলাকার কাছ থেকেই। প্রায় দেড় মাইলের এই পথটি হ্রদের তীর ধরে এগিয়েছে। পাখি দেখার জন্যও এটি চমৎকার জায়গা। ‘হিটেড রাইভ্যালরি’র ভক্তরা এখানে সিরিজে পরিচিত লুন পাখির দেখা পাওয়ার আশায় হাঁটতে পারেন।

ট্রেইল শেষে পৌঁছে যাবেন ঘাটে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ-সাদা রঙের দুটি ঐতিহাসিক স্টিমশিপ। চাইলে এগুলোতে চড়ে হ্রদভ্রমণও করা যায়।

গ্র্যাভেনহার্স্টের শহরের কেন্দ্রেও রয়েছে বেশ কিছু আকর্ষণীয় জায়গা। স্থানীয় কারুশিল্পের বিয়ারের স্বাদ নিতে যেতে পারেন সডাস্ট সিটি ব্রিউইং কোম্পানিতে। পুরোনো দিনের নস্টালজিক আবহের জন্য রয়েছে ব্লু উইলো চা-ঘর। আর হ্রদের ওপর সূর্যাস্ত দেখতে যেতে পারেন ডক অব দ্য বে-তে। স্থানীয় পোশাক ও সামগ্রী কিনতে রয়েছে মাসকোকা বিয়ার ওয়্যার।

শিল্পপ্রেমীদের জন্যও রয়েছে স্থানীয় শিল্পকর্ম ও হাতে তৈরি উপহারের সামগ্রীর গ্যালারি।

সন্ধ্যা নামুক হ্রদের ধারে

আরও কিছুটা হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যায় গুল লেক রোটারি পার্কে। সাঁতার, ক্যানো ও কায়াকিংয়ের জন্য এটি জনপ্রিয় একটি জায়গা।

জুন থেকে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত রবিবার সন্ধ্যায় এখানে বসে ‘বার্জে সংগীত’ কনসার্ট। তবে কোনো আয়োজন না থাকলেও হ্রদের পাড় ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতা অসাধারণ।

ব্যাঙের ডাক, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ আর ধীরে ধীরে অস্ত যাওয়া সূর্য—মাসকোকায় কখনও কখনও এটাই সবচেয়ে ভালো বিনোদন।

ক্র্যানবেরির দেশে

গ্র্যাভেনহার্স্ট থেকে প্রায় ১৫ মাইল উত্তরে বালা। অন্টারিওর ক্র্যানবেরি রাজধানী হিসেবে পরিচিত এই ছোট শহরটি মাসকোকার আরেক আকর্ষণ।

এখানে রয়েছে মাসকোকা লেকস ফার্ম অ্যান্ড ওয়াইনারি—প্রায় ৩৫০ একরের একটি খামার। গাইডের সঙ্গে ক্র্যানবেরির ক্ষেত ঘুরে দেখার পর রয়েছে ওয়াইন চেখে দেখার সুযোগ। খরচ প্রায় ৩০ কানাডীয় ডলার।

নিজের মতো হাঁটতে চাইলে রয়েছে ক্র্যানবেরি ট্রেইল। প্রায় পৌনে এক মাইলের এই পথে ক্র্যানবেরির ক্ষেত ও জলাভূমি ঘুরে দেখা যায়। পুরো খামারে রয়েছে প্রায় ছয় মাইলের হাঁটার পথ।

আরও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার জন্য স্যান্ডসম্যান ট্রেইলে রয়েছে ‘বগ মনস্টার’ ভাস্কর্য। দেখতে অনেকটা ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ সিরিজের ভয়ংকর ডেমোগর্গনের মতো।

দীর্ঘ পথ হাঁটতে চাইলে রয়েছে প্রায় সাড়ে চার মাইলের সুপারবেরি ট্রেইল। পথে রয়েছে ব্লুবেরি হিল, যেখান থেকে আশপাশের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়।

বালা শহরের ছোট ছোট আনন্দ

ক্র্যানবেরির খামার থেকে গাড়িতে মাত্র ১০ মিনিট এগোলেই বালা শহর। শহরের কেন্দ্রের বালা জলপ্রপাত গ্রীষ্মে জনপ্রিয় পিকনিকের জায়গা।

সোমবার হলে কাছের জ্যাসপেন পার্কের কৃষকদের বাজারে ঘুরে দেখা যায়। স্থানীয় স্কোয়াশ, ধোঁয়ায় তৈরি সসেজ থেকে শুরু করে বেলজিয়ান চকলেট সবই পাওয়া যায় সেখানে।

মিষ্টিপ্রেমীদের জন্য রয়েছে ১৯৪৭ সাল থেকে চলে আসা ডন’স বেকারি। এখানকার বিখ্যাত বাটার টার্ট চেখে না দেখলে বালা ভ্রমণ যেন অসম্পূর্ণই থেকে যায়।

হাইকিংয়ের জন্য হাকলবেরি রক

মাসকোকার সবচেয়ে সুন্দর হাঁটার পথগুলোর একটি হতে পারে হাকলবেরি রক ভিউপয়েন্ট ট্রেইল।

প্রায় ২০ মিনিট বনপথ পেরিয়ে ও গোলাপি গ্রানাইটের পাথর বেয়ে উঠলে পৌঁছে যাবেন একটি উঁচু প্রাকৃতিক ভিউপয়েন্টে। সেখান থেকে মাসকোকা হ্রদের বিস্তৃত জলরাশি চোখের সামনে খুলে যায়।

ঠান্ডা বাতাস, বন আর পাথুরে ভূপ্রকৃতির সঙ্গে হ্রদের দৃশ্য মিলিয়ে জায়গাটি হাইকিংপ্রেমীদের জন্য দারুণ।

বিনা খরচে জলক্রীড়ার রোমাঞ্চ

ভ্রমণের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হতে পারে মাসকোকা হ্রদে মঙ্গলবার সন্ধ্যার বিনামূল্যের জল-স্কিইং প্রদর্শনী।

জুনের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে দেখা যায় খালি পায়ে জল-স্কিইং, জেট স্কির দুঃসাহসিক কসরত, ওয়েকবোর্ডিং এবং একাধিক স্কিয়ারকে নিয়ে তৈরি দুর্দান্ত জল-স্কিইং পিরামিড।

পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সামার ওয়াটার স্পোর্টস এই আয়োজন করে আসছে।

সূর্য যখন ধীরে ধীরে হ্রদের ওপারে ডুবছে, তখন পানির ওপর একের পর এক কসরত মাসকোকায় সন্ধ্যা কাটানোর এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে!

সিরিজের উন্মাদনা, প্রকৃতির স্বাভাবিক সৌন্দর্য

‘হিটেড রাইভ্যালরি’ মাসকোকাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে ঠিকই, কিন্তু অঞ্চলটি এখনও সিরিজ-উন্মাদনায় পুরোপুরি বদলে যায়নি।

কোথাও চরিত্রের নামে কফি, কোথাও বিশেষ পেস্ট্রি, ব্র্যান্ডেড টি-শার্ট কিংবা আলাদা কোনো ‘হিটেড রাইভ্যালরি’ ট্যুর এমন আয়োজন খুব একটা চোখে পড়ে না।

আর হয়তো সেটাই মাসকোকার সৌন্দর্য।

আপনি চাইলে শেন বা ইলিয়ার মতো করে কটেজের বারান্দায় বসে হ্রদের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেন। আবার সিরিজের কথা পুরোপুরি ভুলে গিয়েও ঘুরে বেড়াতে পারেন বনপথে, নৌকায় চড়তে পারেন, সূর্যাস্ত দেখতে পারেন কিংবা হ্রদের ধারে বসে স্থানীয় জীবনের ধীর ছন্দ উপভোগ করতে পারেন।

‘হিটেড রাইভ্যালরি’র কটেজ হয়তো আপনাকে মাসকোকায় নিয়ে আসবে। কিন্তু হ্রদ, বন, পাহাড়, বুনো বেরি আর শান্ত কটেজজীবনের মায়াই হয়তো আপনাকে সেখানে আরও কিছুদিন থেকে যেতে বলবে।

সূত্র: দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস