ইতালির সিসিলি শুধু সমুদ্রসৈকত আর ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্যই নয়, বন্যপ্রাণী ও জলাভূমির বৈচিত্র্যের জন্যও ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণ করে। দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভেন্ডিকারি প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা বিশেষভাবে পরিচিত পরিযায়ী পাখি, ফ্লেমিঙ্গো, জলাভূমি, প্রাকৃতিক সৈকত এবং বিস্তীর্ণ লেবুর বাগানের জন্য।
ছোট আকারের হলেও ভেন্ডিকারি সিসিলির গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি সংরক্ষণ এলাকাগুলোর একটি। একসময় এখানে তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা হয়েছিল। পরিবেশবাদীদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর সেই উদ্যোগ ঠেকানো সম্ভব হয় এবং ১৯৮৪ সালে ভেন্ডিকারি প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা প্রতিষ্ঠিত হয়।
তেল শোধনাগারের বদলে সংরক্ষণ এলাকা
১৯৭০-এর দশকে একটি অ্যাসফাল্ট ও পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ভেন্ডিকারিতে তেল শোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। স্থানীয় কর্মকর্তারাও প্রকল্পটিতে অনুমোদন দিয়েছিলেন।
তবে এর বিরোধিতায় এগিয়ে আসেন পরিবেশকর্মী ব্রুনো রাগোনেসে। পরিযায়ী পাখিদের আবাসস্থল রক্ষায় তিনি তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেন এবং স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোকে একত্রিত করেন।
রাগোনেসের প্রচেষ্টায় বিষয়টি স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাঁর যুক্তি ছিল, আফ্রিকা থেকে ইউরোপে আসা পরিযায়ী পাখিদের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ধ্বংস করা শুধু স্থানীয় পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি আন্তর্জাতিক গুরুত্বের বিষয়।
পরবর্তী সময়ে জমি উন্নয়ন ও নির্মাণের চাপ এলেও পরিবেশবাদীরা জলাভূমি রক্ষায় অবস্থান ধরে রাখেন। আন্তর্জাতিক জলাভূমি সংরক্ষণ উদ্যোগের সঙ্গেও বিষয়টি যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত ভেন্ডিকারি সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
দুই ঘণ্টার হাঁটায় দেখা মিলবে নানা আকর্ষণের
ভেন্ডিকারি ঘুরে দেখতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না। প্রায় দুই ঘণ্টার হাঁটাপথে সংরক্ষণ এলাকার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থান দেখা সম্ভব।
পথে রয়েছে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর গ্রিক উপনিবেশ এলোরোর ধ্বংসাবশেষ। এরপর দেখা যায় জলাভূমি ও হ্রদ, যেখানে পরিযায়ী পাখিদের বিচরণ। এর অন্যতম আকর্ষণ গোলাপি ফ্লেমিঙ্গো।
সংরক্ষণ এলাকার দুটি হ্রদে দলবেঁধে দেখা যায় ফ্লেমিঙ্গো। তারা পানিতে খাবার খোঁজে, দলবেঁধে চলাফেরা করে এবং পানিতে অবতরণ করে। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি ভেন্ডিকারির অন্যতম আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা।
কালামোশে সৈকতেও যাওয়া যায়
প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকার অন্যতম জনপ্রিয় স্থান কালামোশে সৈকত। এখানে রয়েছে বালুকাবেলা, জুনিপার গাছ, বুনো ফুল ও ক্যাকটাস। সৈকতের কাছেই রয়েছে গ্রোত্তা দি কালামোশে নামে একটি গুহা।
সৈকত ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ভেন্ডিকারিকে শুধু বন্যপ্রাণী দেখার স্থান নয়, বরং প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানোর জন্যও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
পুরোনো টুনা কারখানায় ইতিহাসের ছাপ
ভেন্ডিকারির আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থান হলো পুরোনো টুনা মাছ প্রক্রিয়াজাত কারখানার ধ্বংসাবশেষ। একসময় এখানে মাত্তাজানা পদ্ধতিতে টুনা মাছ ধরা হতো। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলেছে।
বর্তমানে কারখানাটির বেশিরভাগ অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত। ছাদ নেই, টিকে আছে কেবল কিছু দেয়াল ও স্তম্ভ। পরিত্যক্ত স্থাপনাটি সংরক্ষণ এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
ভেন্ডিকারির আরেক পরিচয় লেবুর বাগান
সংরক্ষণ এলাকার আশপাশে রয়েছে বিস্তীর্ণ লেবুর বাগান। সিসিলির এই অংশে লেবু উৎপাদনের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। বিশেষভাবে পরিচিত ফেম্মিনেল্লো সিরাকুসানো জাতের লেবু।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লেবু, কমলা, মধু ও রিকোটার মতো খাবারও ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে। স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে এসব পণ্য কেনার সুযোগ রয়েছে।
তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ না করাই উচিত। বরং স্থানীয় কৃষকের কাছ থেকে লেবু কিনে নেওয়াই হতে পারে ভ্রমণের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
থাকার অভিজ্ঞতাও হতে পারে আলাদা
ভেন্ডিকারির আশপাশে পুরোনো খামারবাড়ি বা সিসিলিয়ান ভাষায় বাগলিও ধরনের স্থাপনায় থাকার সুযোগও রয়েছে। এসব স্থাপনা ঐতিহ্যবাহী কৃষিজীবন ও স্থানীয় স্থাপত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
প্রকৃতি, ইতিহাস, বন্যপ্রাণী ও স্থানীয় খাবার ভেন্ডিকারি সিসিলির প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর বাইরে অপেক্ষাকৃত শান্ত ও প্রকৃতিনির্ভর ভ্রমণের সুযোগ তৈরি করে।
ভ্রমণকারীদের জন্য যা মনে রাখা জরুরি
ভেন্ডিকারি ঘুরতে গেলে সংরক্ষণ এলাকার নিয়ম মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জলাভূমি, পাখির আবাসস্থল ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা উচিত নয়। পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী দেখার সময় দূরত্ব বজায় রাখা এবং পরিবেশে কোনো ধরনের বর্জ্য না ফেলার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
প্রকৃতি সংরক্ষণ আন্দোলনের ইতিহাস, পরিযায়ী পাখির বিচরণ, প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার নিদর্শন, পুরোনো টুনা কারখানা এবং সিসিলির লেবুর বাগান মিলিয়ে ভেন্ডিকারি প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা সিসিলিতে ভিন্নধর্মী ভ্রমণ অভিজ্ঞতার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য গন্তব্য।