‘দৃশ্য যত সুন্দর, খাবারের মান তত খারাপ’ ভ্রমণজগতে এমন একটি প্রচলিত ধারণা আছে। তবে দক্ষিণ ওয়েলসের গাওয়ার উপদ্বীপ সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, দীর্ঘ উপকূলরেখা, গ্রামীণ পথ আর বৈচিত্র্যময় খাবারের সমন্বয়ে গাওয়ার এখন ভ্রমণ ও রসনাবিলাস দুইয়েরই আকর্ষণীয় স্থান এটি।
১৯৫৬ সালে গাওয়ার যুক্তরাজ্যের প্রথম ‘অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এলাকা’ হিসাবে স্বীকৃতি পায়। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সোয়ানসির একেবারে লাগোয়া হওয়া সত্ত্বেও উপদ্বীপটির বড় অংশ এখনও গ্রামীণ আবহ ধরে রেখেছে। উঁচু ঝোপঝাড়ে ঘেরা সরু পথ, প্রাচীন গির্জা, উপকূলীয় গ্রাম আর বিস্তৃত সমুদ্রসৈকত মিলিয়ে এলাকাটি হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা গাড়িতে ঘোরার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।
গাওয়ারের উপকূল ধরে মাম্বলস থেকে লঘর পর্যন্ত প্রায় ৪৩ মাইল দীর্ঘ ওয়েলশ উপকূলীয় পথ রয়েছে। পুরো পথটি একসঙ্গে হাঁটার পরিকল্পনা থাকলেও পথে খাবারের বৈচিত্র্য ভ্রমণকারীদের জন্য আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। মাম্বলস থেকে শুরু করে উপকূলের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে আইসক্রিমের দোকান, সামুদ্রিক খাবারের আয়োজন, বেকারি, ক্যাফে, পানশালা ও উচ্চমানের রেস্তোরাঁ।
মাম্বলসে যাত্রার শুরু
গাওয়ার ভ্রমণের শুরু হতে পারে মাম্বলস থেকে। সোয়ানসির নগরাঞ্চল এখানে এসে রূপ নিয়েছে রঙিন ভিক্টোরিয়ান আমলের বাড়িঘরে সাজানো মনোরম সমুদ্রতীরবর্তী গ্রামে। গ্রামের প্রান্তে রয়েছে ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি ঐতিহাসিক জেটি, যা স্থানীয়দের কাছে ব্রিস্টল চ্যানেলের ‘মুকুট’ হিসেবে পরিচিত।
জেটিটির মালিক বোলম পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি বার্ট বোলম। কয়েক বছর আগে সফরে এসে প্রিন্স উইলিয়াম তার পেশা বেছে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। বার্ট জানিয়েছিলেন, তিনি বাবার কাছ থেকেই এই কাজ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন।
জেটিতে সংস্কারকাজ চললেও কাছাকাছি বোলম পরিবারের আরেক প্রতিষ্ঠান ‘অন দ্য রকস’-এর সমুদ্রের দিকে বেরিয়ে থাকা টেরেস থেকে জেটিটির চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়। স্টেক রেস্তোরাঁটির এই টেরেস সূর্যাস্ত উপভোগের জন্যও আকর্ষণীয়।
আইসক্রিম থেকে সামুদ্রিক খাবার
মাম্বলসে খাবারের তালিকায় রয়েছে ‘গাওয়ার ব্রুয়ারি ট্যাপরুম’ এবং স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ‘জো’স’ আইসক্রিম পার্লার। প্রতিদিন দোকানেই তৈরি করা ভ্যানিলা আইসক্রিম এখানে বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
আরও এগিয়ে উপকূলীয় খাবারের মধ্যে নজর কাড়ে ‘গাওয়ার সিফুড হাট’। স্থানীয় টকদই-রুটি ও নোনতা শিরগার মাখন দিয়ে তৈরি কাঁকড়ার স্যান্ডউইচ এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। দিনের সময় অনুযায়ী ভাজা ছোট সাদা মাছ কিংবা ভাজা ককলও পাওয়া যায়।
লিমস্লেড উপসাগরের দিকে এগোলে পাওয়া যায় আরেক আইসক্রিম প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্টেস’। এরপর ল্যাংল্যান্ডের সৈকত থেকে থ্রি ক্লিফস উপসাগর পর্যন্ত উপকূলের দৃশ্য ক্রমেই আরও বিস্তৃত ও নাটকীয় হয়ে ওঠে।
থ্রি ক্লিফসের কাছাকাছি ‘বেকন হোল’ গুহাও রয়েছে। নামটি শুনে খাবারের কথা মনে হলেও গুহাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রাচীন সরু-নাকওয়ালা গণ্ডার ও সোজা-দাঁতওয়ালা হাতির হাড় পাওয়া গেছে, যেগুলোর কিছু এখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।
গ্রিক খাবারের চমক
সাউথগেট গ্রামে সামান্য ঘুরে গেলে পাওয়া যায় ‘দ্য গাওয়ার ডেলি’। ছোট্ট এই গ্রিক ক্যাফেতে গুঁড়ো চিনি ছড়ানো বুগাতসা কাস্টার্ড পাই এবং তীব্র স্বাদের কফি বেশ জনপ্রিয়। গাওয়ারের ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকায় এমন গ্রিক সংযোজন এই উপকূলীয় অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্যই তুলে ধরে।
থ্রি ক্লিফস থেকে প্রায় ২০ মিনিটের পথ ভেতরে পেনার্ড পিলের আঁকাবাঁকা জলধারা ধরে এগোলে নরম্যান আমলের দুর্গের ধ্বংসাবশেষের কাছে দেখা যায় ‘গাওয়ার হেরিটেজ সেন্টার’। দ্বাদশ শতাব্দীর একটি জলচালিত মিলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই পর্যটনকেন্দ্রে রয়েছে সাইডার তৈরির প্রেস, জৈব কৃষি প্রকল্প, সাওয়ারক্রাউট উৎপাদক, গয়না নির্মাতা ও সাইকেলের দোকান।
তবে এখানকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘লিটল ভ্যালি বেকারি’। ঐতিহ্যবাহী গাওয়ার রুটি তৈরি হয় মিলের বার্লির আটা দিয়ে। পাশাপাশি পাওয়া যায় খসখসে পেস্ট্রি, ফোকাচ্চা স্যান্ডউইচ, বড় আকারের কুকি এবং বিভিন্ন ধরনের ইউরোপীয় বেকারি খাবার। দীর্ঘপথের হাঁটুরেদের জন্য এটি কার্যত একটি আদর্শ বিরতির স্থান।
অক্সউইচে মিশেলিন তারকার রেস্তোরাঁ
থ্রি ক্লিফস থেকে উপকূল ধরে আরও প্রায় পাঁচ মাইল গেলে অক্সউইচ। এখানে ভ্রমণকারীদের বিশেষ গন্তব্য ‘বিচ হাউস’, মিশেলিন তারকাপ্রাপ্ত একটি রেস্তোরাঁ।
রেস্তোরাঁটির টেরেস থেকে উপকূলের দৃশ্য যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি খাবারের উপকরণেও রয়েছে স্থানীয়তার ছাপ। রেস্তোরাঁয় গলদা চিংড়ি সরবরাহ করে দুটি স্থানীয় নৌকা। শেফ হুয়েল গ্রিফিথ জানান, প্রতিদিন সকালে প্রয়োজনীয় খাবারের তালিকা নৌকার মালিকদের কাছে পাঠানো হয়।
নর্থ গাওয়ারের লবণাক্ত জলাভূমি থেকে আসে ভেড়ার মাংস। পেন-ক্লডের সেলউইন’স থেকে আসে ল্যাভারব্রেডে ব্যবহৃত সামুদ্রিক শৈবাল। ঐতিহ্যবাহী ল্যাভারব্রেডের ধারণাকে আধুনিকভাবে ব্যবহার করে তৈরি করা হয় বিশেষ রোলও।
ডেজার্টের তালিকায় রয়েছে মাল্টের মুস, উড সরেল ও গাঁজন করা পাইন সিরাপের সমন্বয়—গাওয়ারের স্থানীয় উপকরণ ও আধুনিক রান্নার কৌশলের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
পোর্ট আইনন থেকে রসিলি
অক্সউইচের পর আরও পাঁচ মাইল গেলে পোর্ট আইনন। ছোট পরিসরে তৈরি জিনের জন্য এখানকার ‘গাওয়ার জিন কোম্পানি’ বিশেষ পরিচিত। স্থানীয় উপকরণ ও কারুশিল্পভিত্তিক উৎপাদন পদ্ধতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি গাওয়ারের পানীয় সংস্কৃতির একটি স্বতন্ত্র অংশ হয়ে উঠেছে।
এরপর আরও ছয় মাইল পথ পেরিয়ে রসিলি। একসময় ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইট ট্রিপঅ্যাডভাইজার রসিলিকে বিশ্বের নবম সেরা সৈকত হিসেবে উল্লেখ করেছিল। উপাধিটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সৈকতটির সৌন্দর্য নিয়ে তেমন প্রশ্ন নেই। প্রায় তিন মাইল দীর্ঘ এই উপকূলীয় অঞ্চল গাওয়ারের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
ন্যাশনাল ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে থাকায় রসিলি এখনো ব্যাপক বাণিজ্যিক স্থাপনার হাত থেকে অনেকটাই মুক্ত। পাহাড়ি পথ ধরে নামার আগে ‘ভিউ ক্যাফে’-তে খাওয়ার সুযোগ রয়েছে। রঙিন ভেগান ‘পাওয়ার বোল’, ঘরে তৈরি ফালাফেল, রেয়ারবিট ও বারা ব্রিথ—সব মিলিয়ে এখানে স্থানীয় ও আধুনিক খাবারের সমন্বয় দেখা যায়।
কাছেই রয়েছে ওয়ার্মস হেড উপকূল পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। হাঁটাপথের এই অংশে প্রকৃতি ও সমুদ্রের দৃশ্যই প্রধান আকর্ষণ।
হোয়াইটফোর্ড স্যান্ডস ও শেষ পর্ব
উত্তর উপকূলে পৌঁছালে সামনে আসে হোয়াইটফোর্ড স্যান্ডস আরেকটি বিস্তৃত সোনালি সৈকত। এর কাছাকাছি ল্যানম্যাডকের ‘ব্রিটানিয়া ইন’-এ স্থানীয় লবণাক্ত জলাভূমির ভেড়ার মাংস দিয়ে তৈরি ক্রোকেট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এখান থেকে পেন-ক্লড পর্যন্ত উপকূল ও জলাভূমির মধ্য দিয়ে আরও প্রায় সাত মাইল পথ রয়েছে। এই অংশটুকু গাওয়ার উপকূলীয় পথের শেষ পর্যায়গুলোর একটি।
পেন-ক্লডে পৌঁছানোর পর ভ্রমণ শেষ করার উপযুক্ত জায়গা হতে পারে ‘গাওয়ার ব্রুয়ারি’। স্থানীয়ভাবে তৈরি পানীয়ের সঙ্গে দীর্ঘ উপকূলপথ অতিক্রমের সাফল্য উদ্যাপন করা যায়। অ্যালকোহলবিহীন ‘শূন্য’ বিয়ারও তাদের তালিকায় রয়েছে।
গাওয়ার তাই শুধু সমুদ্রসৈকত, পাহাড়ি পথ কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের গন্তব্য নয়। উপকূলের প্রতিটি বাঁকে স্থানীয় কৃষি, সামুদ্রিক খাবার, বেকারি, পানীয় ও রেস্তোরাঁর যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা এই ওয়েলশ উপদ্বীপকে ভ্রমণ ও রসনার এক অনন্য মিলনস্থলে পরিণত করেছে।

টাস্কানি নয়, মাডেফোর্ডেই মিলবে ইংল্যান্ডের সমুদ্রসৈকতের আসল স্বাদ







