যুক্তরাষ্ট্রে কেন বারবার ঘটছে দীর্ঘ টারম্যাক বিলম্ব

বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিলম্ব নতুন কোনওি ঘটনা নয়। তবে উড়োজাহাজে যাত্রী উঠিয়ে নেওয়ার পর সেটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা টারম্যাকে আটকে থাকা যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে ভোগান্তিকর পরিস্থিতিগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি এমন দীর্ঘ টারম্যাক বিলম্বের ঘটনা আবারও দ্রুত বাড়ছে।

উড়োজাহাজে যাত্রী ওঠার পর ফ্লাইট বিলম্বিত হয়ে তিন ঘণ্টার বেশি সময় টারম্যাকে আটকে থাকাকে বলা হয় ‘এক্সটেন্ডেড টারম্যাক ডিলে’। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এমন ঘটনা ঘটেছিল প্রায় ৯০০টি। এরপর পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হয়। ২০১১ সালে এ সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ১৪টিতে। এমনকি ২০১১ সালে হারিকেন আইরিনের কারণে প্রায় ১২ হাজার ফ্লাইট বাতিল হলেও কোনও উড়োজাহাজ তিন ঘণ্টার বেশি সময় টারম্যাকে আটকে থাকার ঘটনা ঘটেনি। 

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি আবার বদলেছে। ২০২৫ সালে তিন ঘণ্টার বেশি সময় টারম্যাকে আটকে থাকার ঘটনা ছিল ৭০০টিরও বেশি। আর ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই এমন ৩৪২টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সাল ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন বিভাগ (ডিওটি) এ ধরনের বিলম্বের ওপর নজরদারি শুরু করার পর সবচেয়ে বেশি টারম্যাক বিলম্বের বছর হতে পারে। 

কেন বাড়ছে টারম্যাক বিলম্ব?

এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। আধুনিক এয়ারলাইনগুলো যত দ্রুত সম্ভব উড়োজাহাজকে আকাশে রাখতে চায়। বিমানবন্দরে গেটের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় যাত্রীদের উড়োজাহাজে তুলে টারম্যাকে অপেক্ষা করানো হলে সেই গেটটি পরবর্তী উড়োজাহাজের জন্য খালি রাখা যায়। একই সঙ্গে আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই দ্রুত উড্ডয়নের জন্য উড়োজাহাজ প্রস্তুত থাকে। 

তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন আবহাওয়া বা অন্য কোনও কারণে উড্ডয়ন বন্ধ হয়ে যায়। একটি ঝড় বা সাময়িক অপারেশনাল সমস্যার কারণে কয়েকটি ফ্লাইট থেমে গেলে পরবর্তী সময়ে উড়োজাহাজের জট তৈরি হয়। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও সেই জট কাটাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যেতে পারে।

এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের কর্মীসংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। কোনও কোনও বিমানবন্দরে উড্ডয়নের মধ্যবর্তী সময় বাড়াতে হচ্ছে, আবার কখনো উড্ডয়ন সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হচ্ছে। ফলে রানওয়েতে উড়োজাহাজের চাপ বাড়ছে। 

আবহাওয়াও বড় কারণ

এয়ারলাইনগুলোর পক্ষে কথা বলা সংগঠন এয়ারলাইনস ফর আমেরিকা সাম্প্রতিক টারম্যাক বিলম্বের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘন ঘন ও পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হয়ে পড়া তীব্র আবহাওয়াকে দায়ী করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার ধরন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন দিয়ে টারম্যাক বিলম্বের এত দ্রুত বৃদ্ধি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। 

নিয়ম থাকলেও কেন কমছে না?

২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন বিভাগ এমন নিয়ম চালু করে, যার আওতায় অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে তিন ঘণ্টার বেশি সময় যাত্রীদের উড়োজাহাজে আটকে রাখলে প্রতি যাত্রীর জন্য ২৭ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত জরিমানা করা যেতে পারে। এই নিয়ম চালুর পর টারম্যাক বিলম্ব নাটকীয়ভাবে কমে যায়। 

তবে বর্তমানে এই নিয়মের প্রয়োগ কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০১০ সালের পর বেশির ভাগ দীর্ঘ টারম্যাক বিলম্বের ঘটনায় কোনও জরিমানা হয়নি। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৭০০টিরও বেশি এমন ঘটনা ঘটলেও জরিমানার সংখ্যা ছিল সীমিত।

২০১৮ সালে অ্যালিজিয়েন্ট এয়ারকে ১০টি উড়োজাহাজে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখার ঘটনায় ২ লাখ ২৫ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। আবার ২০২৫ সালে আমেরিকান এয়ারলাইনসকে ৪৩টি টারম্যাক বিলম্বের ঘটনায় ৪১ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়, যা এ ধরনের ঘটনায় অন্যতম বড় জরিমানা। 

যাত্রীদের জন্য এর অর্থ কী?

টারম্যাকে আটকে থাকা শুধু দীর্ঘ অপেক্ষার বিষয় নয়। তিন ঘণ্টার কম সময়ের বিলম্ব হলেও যাত্রীদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্বস্তিকর হতে পারে। দীর্ঘ অপেক্ষায় খাবার, পানি, শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগ, উড়োজাহাজের তাপমাত্রা এবং মানসিক চাপ সবকিছুই বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

তাই প্রশ্ন উঠছে বিমান সংস্থাগুলো কি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফ্লাইট ছাড়ার চেষ্টা করবে, নাকি পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে আগেভাগেই ফ্লাইট বাতিল বা গেটে ফিরিয়ে আনবে?

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথে দীর্ঘ টারম্যাক বিলম্ব আবারও বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। আর এর প্রভাব সবচেয়ে সরাসরি পড়ছে সেই যাত্রীদের ওপর, যারা উড়োজাহাজে উঠে গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরুর অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা রানওয়েতে বসে থাকছেন।

সূত্র: বিবিসি