যে জাদুঘরে পৃথিবীকে বারবার নতুন করে আবিষ্কার করা যায়

ভিয়েনা ভ্রমণে অস্ট্রিয়ান ন্যাশনাল লাইব্রেরি, ইম্পেরিয়াল প্যালেস কিংবা বিখ্যাত জাদুঘরগুলোর পাশাপাশি তালিকায় রাখতে পারেন একটি তুলনামূলক কম পরিচিত স্থান গ্লোব মিউজিয়াম। ভিয়েনার ১৭শ’ শতকের ঐতিহাসিক পালে মোয়ার্ড ভবনের ভেতরে থাকা এই জাদুঘরটি জনসাধারণের জন্য বিশ্বের একমাত্র উন্মুক্ত জাদুঘর, যা পুরোপুরি গ্লোব বা ভূগোলের গোলককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

জাদুঘরটিতে রয়েছে ২২০টিরও বেশি দুর্লভ ও প্রাচীন গ্লোব। সংগ্রহের বেশির ভাগ গ্লোবই তৈরি হয়েছে ১৮৫০ সালের আগে। বিশালাকৃতির করোনেলি গ্লোব থেকে শুরু করে ছোট, ভাঁজ করে পকেটে রাখা যায় এমন গ্লোব বৈচিত্র্য রয়েছে পুরো সংগ্রহজুড়ে।

তবে এটি শুধু পুরোনো গ্লোব দেখার জায়গা নয়। এসব নিদর্শনের মাধ্যমে বোঝা যায়, বিভিন্ন সময়ে মানুষ পৃথিবীর আকৃতি, ভূখণ্ড, সমুদ্র ও মহাকাশ সম্পর্কে কী জানত এবং কীভাবে অজানা বিষয়গুলোকে কল্পনা করত।

গ্যালারিতে গেলে দেখতে পাবেন বিভিন্ন সময়ের স্থল ও আকাশের গ্লোব (ছবি: বিবিসি)

গ্লোবের পাশাপাশি মহাকাশের ইতিহাস

জাদুঘরের প্রদর্শনী শুরু হয় গোল্ডেন ক্যাবিনেট দিয়ে। গ্রিক পুরাণের দৃশ্য আঁকা পুরোনো ফ্রেস্কোয় সাজানো এই কক্ষে রয়েছে গ্লোব-সম্পর্কিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক যন্ত্র।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য টেলুরিয়াম, যা সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর কক্ষপথ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। রয়েছে আর্মিলারি স্ফিয়ার, যার ধাতব বলয়ের মাধ্যমে আকাশের বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের অবস্থান ও গতিবিধি বোঝানো হয়।

জাদুঘরের চারটি প্রধান গ্যালারিতে বিভিন্ন সময়ের স্থল ও আকাশের গ্লোব সাজানো রয়েছে।

যে গ্লোবে পৃথিবী এখনও অসম্পূর্ণ

সংগ্রহের উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ১৫০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তৈরি দুটি গ্লোব। একই কারিগরের তৈরি এই স্থল ও আকাশের গ্লোব দুটির মধ্যে তৎকালীন পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা ফুটে উঠেছে।

স্থলগ্লোবটিতে ইউরোপ, ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকার উপকূলের বিস্তারিত স্থাননাম রয়েছে। কিন্তু উত্তর আমেরিকার চিত্র অসম্পূর্ণ। এশিয়ার আকৃতিও বাস্তবের তুলনায় বেশ বিকৃত। অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকার পরিবর্তে রয়েছে একটি কাল্পনিক দক্ষিণ মহাদেশ। প্রশান্ত মহাসাগরে আবার দ্বীপের বদলে দেখা যায় সমুদ্রদানব।

এখানে এলে তৎকালীন পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা ফুটে ওঠে (ছবি: বিবিসি)

আকাশের গ্লোবটিতে রেনেসাঁ যুগের জ্যোতির্বিদ্যার পাশাপাশি রয়েছে গ্রিক পুরাণের বিভিন্ন চরিত্র, যেমন পেগাসাস ও পার্সিয়াস।

মানচিত্রে ধরা পড়া পুরোনো বিশ্বাস

পুরোনো গ্লোবগুলো থেকে শুধু ভূগোল নয়, সেই সময়কার মানুষের বিশ্বাস ও চিন্তাভাবনারও ধারণা পাওয়া যায়।

অনাবিষ্কৃত সমুদ্রের জায়গায় ড্রাগন ও অন্যান্য কাল্পনিক প্রাণীর ছবি যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু গ্লোবে ক্যালিফোর্নিয়াকে দ্বীপ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কিছু নিদর্শনে ঔপনিবেশিক যুগের চিন্তাধারারও প্রতিফলন রয়েছে। কোথাও আদিবাসীদের নরখাদক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, আবার আফ্রিকার উপকূলে স্পেন ও পর্তুগালের পতাকা বসিয়ে ভূখণ্ডের ওপর তাদের কর্তৃত্ব বোঝানো হয়েছে।

জাদুঘরের পরিচালক নিকোলাউস শোবেসবার্গারের মতে, এসব গ্লোবকে শুধু সুন্দর শিল্পকর্ম হিসেবে দেখলে হবে না; এগুলো যে সময়ে তৈরি হয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করতে হবে। কারণ প্রতিটি গ্লোবই একই সঙ্গে একটি রেকর্ড—মানুষ তখন পৃথিবী সম্পর্কে কী জানত এবং কী জানত না, তার।

চাঁদের মানচিত্রে বদলে যাওয়া জ্ঞান

জাদুঘরের আরেকটি আকর্ষণ ১৯৬১ সালের একটি চন্দ্রগ্লোব। এতে চাঁদের সামনের অংশ বিস্তারিতভাবে মানচিত্রে দেখানো হলেও পেছনের অংশ ফাঁকা রাখা হয়েছিল। কারণ তখনও চাঁদের দূরবর্তী অংশ সম্পর্কে মানুষের প্রত্যক্ষ তথ্য ছিল না।

দুই বছর পর তৈরি আরেকটি চন্দ্রগ্লোবে সেই অংশ যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি থাকা দুটি গ্লোব দেখায়, মহাকাশ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান কত দ্রুত বদলে যাচ্ছিল।

কিছু নিদর্শনে ঔপনিবেশিক যুগের চিন্তাধারারও প্রতিফলন রয়েছে (ছবি: সংগৃহীত)

সামনের হলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নিদর্শন বেহাইম গ্লোবের একটি প্রতিরূপ। মার্টিন বেহাইম ১৪৯২ সালে মূল গ্লোবটি তৈরি করেন। তখনও আমেরিকা ইউরোপীয় মানচিত্রে যুক্ত হয়নি। ফলে গ্লোবটিতে ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝখানে রয়েছে বিশাল অজানা সমুদ্র।

গ্লোব কীভাবে সাধারণ মানুষের ঘরে এল

জাদুঘরের সংগ্রহে গ্লোবের সামাজিক ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম দিকে গ্লোব ছিল মূলত অভিজাত ও ধনী বণিকদের বিলাসবহুল সামগ্রী। পরে প্রযুক্তির উন্নতি ও উৎপাদন খরচ কমার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো ছোট ও সহজলভ্য হয়ে ওঠে।

একসময় গ্লোব স্কুলের শ্রেণিকক্ষ, অফিস ও বসার ঘরের পরিচিত সামগ্রী হয়ে ওঠে। শিশুদের শিক্ষার পাশাপাশি বিনোদনের উপকরণ হিসেবেও এর ব্যবহার শুরু হয়।

জাদুঘরের পরিচালক শোবেসবার্গারের মতে, গ্লোব শুধু বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নয়; এটি মানুষের কল্পনাকেও উসকে দেয়। একটি ছোট গোলকের দিকে তাকিয়েই দূরদেশ, অজানা ভূখণ্ড ও পৃথিবীর অন্য প্রান্ত সম্পর্কে কল্পনা করা যায়।

এই জাদুঘরে ড্রাগন ও অন্যান্য কাল্পনিক প্রাণীর ছবিও দেখা যায় (ছবি: সংগৃহীত)

ভিয়েনার রাস্তায় আরও গ্লোব

গ্লোব মিউজিয়ামের অভিজ্ঞতা শুধু জাদুঘরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। ভিয়েনার বিভিন্ন ভবনের ছাদ ও সম্মুখভাগেও প্রায় ৫০টি গ্লোব রয়েছে। অনেকগুলোই শহরের স্থাপত্যের অংশ হিসেবে চোখের আড়ালে রয়েছে।

জাদুঘরের নতুন প্রদর্শনীতে এসব গ্লোবের অবস্থান একটি ভার্চুয়াল মানচিত্রে দেখানো হয়েছে। ফলে জাদুঘর ঘুরে বেরিয়ে ভিয়েনার রাস্তায় হাঁটার সময় দর্শনার্থীরা চাইলে এসব গ্লোবও খুঁজে দেখতে পারেন।

ভিয়েনার প্রচলিত পর্যটন আকর্ষণের বাইরে কিছু দেখতে চাইলে গ্লোব মিউজিয়াম হতে পারে ভিন্নধর্মী একটি গন্তব্য। এখানে শুধু পুরোনো মানচিত্র বা গোলক দেখা যায় না; বরং কয়েক শতাব্দী ধরে পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান কীভাবে বদলেছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও একসঙ্গে দেখা যায়।