এক দেশে বেড়াতে গিয়ে সেখানেই সন্তানের জন্ম। শুনতে সাধারণ ভ্রমণের মতো মনে হলেও যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রবণতা বহু দিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। ‘বার্থ ট্যুরিজম’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থায় বিদেশী অন্তঃসত্ত্বা নারীরা মূলত সন্তানের জন্মের মাধ্যমে জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করেন। এবার এই ধরনের ভ্রমণের বিরুদ্ধে আরও কড়া অবস্থান নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
পর্যটনের দুনিয়ায় ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বলতে সাধারণত এমন ভ্রমণকে বোঝানো হয়, যেখানে কোনও অন্তঃসত্ত্বা নারী অ-অভিবাসী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন এবং পরিকল্পিতভাবে সেখানে সন্তানের জন্ম দেন। সন্তান জন্মের পর মা ও শিশু নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারেন। অর্থাৎ ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে শুধুমাত্র বেড়ানো নয়, বরং সন্তানের জন্মকে ঘিরে ভবিষ্যতের নাগরিকত্বের সম্ভাবনা তৈরি করা।
কেন আলোচনায় ‘বার্থ ট্যুরিজম’?
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ দিন ধরে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতি চালু রয়েছে। দেশটির মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশুরা সাধারণত জন্মের ভিত্তিতে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী। ফলে কিছু বিদেশি পরিবার সন্তানের জন্মের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পরিকল্পনা করেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু বিদেশি নাগরিক অভিবাসন ব্যবস্থার সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রশাসনের যুক্তি, শুধুমাত্র সন্তানের জন্মের উদ্দেশ্যে পর্যটন বা অ-অভিবাসী ভিসা ব্যবহার করা হলে সেটিকে সাধারণ ভ্রমণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
এই অবস্থান থেকেই ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন নির্বাহী নির্দেশের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর নাগরিকত্বের যোগ্যতা নিয়ে নতুন নিয়ম কার্যকর করার চেষ্টা করছে প্রশাসন।
পর্যটকদের জন্য কী বদলাতে পারে?
এই নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করতে চাওয়া অন্তঃসত্ত্বা বিদেশী নারীদের ক্ষেত্রে। ভিসা আবেদনের সময় ভ্রমণের উদ্দেশ্য, থাকার সময়কাল এবং যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা রয়েছে কি না এসব বিষয় আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
ফলে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে শুধু বিমানের টিকিট ও থাকার জায়গা ঠিক করলেই হবে না। ভিসার শর্ত, চিকিৎসা খরচ, হাসপাতালের নিয়ম এবং প্রবেশসংক্রান্ত বিধিনিষেধ সম্পর্কেও আগে থেকে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে বিদেশে সন্তান জন্ম দেওয়ার খরচ অনেক বেশি হতে পারে। পর্যটক হিসেবে গিয়ে চিকিৎসা করানোর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমার আওতা কতটা, হাসপাতালের বিল কে বহন করবে এবং ভিসার শর্ত ভঙ্গ হচ্ছে কি না এসব বিষয় ভ্রমণের আগেই যাচাই করা প্রয়োজন।
কত মানুষ ‘বার্থ ট্যুরিজম’-এর সঙ্গে যুক্ত?
এই ধরনের ভ্রমণের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে অবশ্য নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি জন্মসংক্রান্ত তথ্য এবং স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর হিসাবেও পার্থক্য রয়েছে।
মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের অনুমান অনুযায়ী, ‘বার্থ ট্যুরিজ়ম’-এর মাধ্যমে প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০ হাজার থেকে ২৬ হাজার শিশুর জন্ম হতে পারে। তবে এই সংখ্যা অনুমাননির্ভর। অন্যদিকে সরকারি পরিসংখ্যানে বিদেশী মায়েদের সন্তান জন্মের যে তথ্য পাওয়া যায়, তার সঙ্গে ‘বার্থ ট্যুরিজম’-এর সংখ্যা সরাসরি এক করে দেখা যায় না।
১৪তম সংশোধনী ঘিরে আইনি বিতর্ক
‘বার্থ ট্যুরিজম’ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী। ১৮৬৮ সালে গৃহীত এই সংশোধনী যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করে।
ট্রাম্প প্রশাসন এই নীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলেও আদালতে তা বড় বাধার মুখে পড়েছে। ফলে নির্বাহী নির্দেশের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার চেষ্টা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে আইনি লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
এই কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করতে চাওয়া বিদেশি পর্যটকদের জন্য পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা পর্যটকদের ক্ষেত্রে ভিসা ও প্রবেশের নিয়ম ভবিষ্যতে আরও কঠোর হতে পারে।
পর্যটকদের জন্য বার্তা কী?
‘বার্থ ট্যুরিজম’ নিয়ে বিতর্ক থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং ভিসার শর্ত সম্পর্কে স্বচ্ছ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চিকিৎসা বা সন্তান জন্মের মতো বিষয় ভ্রমণ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন ও ভিসা নীতি আগে থেকেই জেনে নেওয়া দরকার।
কারণ পর্যটন ভিসা নিয়ে বিদেশে গিয়ে নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে কোনও কাজ করলে ভিসা জটিলতা, প্রবেশে বাধা বা ভবিষ্যতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।
তাই যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের পরিকল্পনা করা অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য এখন শুধু গন্তব্য, হোটেল বা বিমানের টিকিট বাছাই করাই যথেষ্ট নয়। ভ্রমণের আগে ভিসার নিয়ম, চিকিৎসা সংক্রান্ত শর্ত এবং সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন সব কিছু যাচাই করাই হতে পারে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।