শহরের ব্যস্ততা, যানজট আর কোলাহল থেকে কয়েক দিনের জন্য দূরে যেতে চাইলে নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার চন্দ্রডিঙ্গা হতে পারে দারুণ এক ঠিকানা। পাহাড়, নদী, সবুজ বন আর ঝরনার সৌন্দর্যে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে দিন দিন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। মাত্র এক থেকে দুই দিনের পরিকল্পনাতেই ঘুরে দেখা সম্ভব বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান।
পাহাড়-নদীর সৌন্দর্যে দুর্গাপুর
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে প্রকৃতির বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। সোমেশ্বরী নদী, বিজয়পুরের সাদামাটির পাহাড়, নীল পানির লেক, সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি এলাকা ও স্থানীয় সংস্কৃতি এখানে একসঙ্গে পাওয়া যায় ভিন্ন স্বাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। জেলা শহর থেকে দুর্গাপুরে পৌঁছে স্থানীয় অটোরিকশা, মোটরসাইকেল বা অন্যান্য যানবাহনে আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা যায়।
দুর্গাপুরের অন্যতম আকর্ষণ বিজয়পুর। সোমেশ্বরী নদী পেরিয়ে বিজয়পুরের দিকে এগোতে থাকলে বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্য। সাদামাটির পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি আর পাহাড়ি পরিবেশ ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে। সরকারি পর্যটন তথ্যেও বিজয়পুরকে দুর্গাপুরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রানীখং মিশন, বিজিবি ক্যাম্প এলাকা, জিরো পয়েন্টসহ সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন স্থানও ঘুরে দেখা যায়। নদী পারাপার ও স্থানীয় পরিবহনের অভিজ্ঞতা ভ্রমণে যোগ করে আলাদা মাত্রা।
এবার গন্তব্য চন্দ্রডিঙ্গা
দুর্গাপুরের পাশাপাশি কলমাকান্দার পাঁচগাঁওয়ের চন্দ্রডিঙ্গা হতে পারে ভ্রমণের আরেক আকর্ষণ। চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড় কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের পাঁচগাঁও এলাকায় অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে এটি পাঁচগাঁও টিলা বা কলমাকান্দার পাহাড় নামেও পরিচিত।
পাহাড়ি পথ ধরে ওপরে উঠলে চারপাশের বিস্তৃত সবুজ, পাহাড় আর সীমান্ত এলাকার প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখে পড়ে। বর্ষায় মেঘ-কুয়াশায় পাহাড়ি পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও মনোরম। কোথাও কোথাও ছোট জলপ্রপাতও দেখা যায় বলে ভ্রমণকারীদের কাছে জায়গাটির আকর্ষণ আরও বেড়েছে।
চন্দ্রডিঙ্গাকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে একটি জনশ্রুতিও প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে, একসময় চাঁদ সওদাগরের একটি নৌকা এখানে ডুবে গিয়েছিল। সেই গল্প থেকেই পাহাড়টির নাম ‘চন্দ্রডিঙ্গা’ হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে বলা হয়।
কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে প্রথমে নেত্রকোনা হয়ে দুর্গাপুরে যাওয়া যায়। নেত্রকোনা থেকে দুর্গাপুরের দূরত্ব প্রায় ৩৮ কিলোমিটার। বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেলে এই পথে যাওয়া সম্ভব। দুর্গাপুর পৌঁছে স্থানীয় যানবাহনে আশপাশের পর্যটন স্পট ঘুরে দেখা যায়।
চন্দ্রডিঙ্গা যেতে হলে নেত্রকোনা থেকে কলমাকান্দার দিকে যেতে হবে। এরপর পাঁচগাঁও এলাকায় পৌঁছে স্থানীয় যানবাহন বা মোটরসাইকেলের মাধ্যমে পাহাড়ের কাছে যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে নেত্রকোনা ও কলমাকান্দা রুটে বাস চলাচলের তথ্যও বিভিন্ন ভ্রমণ গাইডে পাওয়া যায়।
খরচ কত হতে পারে?
দুর্গাপুরে দুই দিনের একটি সাধারণ ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক ২ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। যাতায়াত, স্থানীয় পরিবহন, থাকা, খাবার ও অন্যান্য খরচের ওপর মোট বাজেট নির্ভর করবে।
অন্যদিকে, এক দিনের চন্দ্রডিঙ্গা ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক ১ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মতো খরচ হতে পারে বলে সাম্প্রতিক একটি ভ্রমণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দলবদ্ধভাবে গেলে স্থানীয় যানবাহন ও থাকার খরচ ভাগ করে নেওয়ার কারণে বাজেট আরও কমানো সম্ভব।
তবে ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সময়, মৌসুম এবং পর্যটকের সংখ্যার ওপর পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাত্রার আগে স্থানীয় পরিবহন ও আবাসনের বর্তমান ভাড়া জেনে নেওয়াই ভালো।
কখন যাবেন?
দুর্গাপুর ও চন্দ্রডিঙ্গা সারা বছরই ভ্রমণের উপযোগী হলেও বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পাহাড়, নদী ও সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য অন্যরকম হয়ে ওঠে। তবে বৃষ্টির সময়ে পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হতে পারে। চন্দ্রডিঙ্গা ভ্রমণের সময় ভালো গ্রিপের জুতা, পর্যাপ্ত পানি, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এক সফরে দুই রকম অভিজ্ঞতা
দুর্গাপুরে চাইলে নদী, সাদামাটির পাহাড় ও পরিচিত পর্যটন স্পট ঘুরে অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক ভ্রমণ করা যায়। আর চন্দ্রডিঙ্গা অপেক্ষা করছে একটু বেশি পাহাড়ি ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ভ্রমণকারীদের জন্য। তাই সময় হাতে থাকলে এক সফরেই দুর্গাপুর ও চন্দ্রডিঙ্গা ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
পাহাড়ের সবুজ, নদীর স্রোত, মেঘে ঢাকা টিলা আর সীমান্ত এলাকার নির্জন প্রকৃতির নেত্রকোনার এই অঞ্চল হতে পারে ব্যস্ত জীবন থেকে সাময়িক বিরতির সুন্দর একটি ঠিকানা। তবে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানোও ভ্রমণকারীর দায়িত্ব।