যাত্রীবাহী বিমানের চেয়েও ওপরে কেন উড়ে কিছু প্রাইভেট জেট?

বিমানে ভ্রমণের সময় জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে দেখা যায়, আকাশে থাকা বেশিরভাগ বিমানই প্রায় একই উচ্চতায় উড়ছে। সাধারণ যাত্রীবাহী বিমান সাধারণত মেঘের কয়েক হাজার ফুট ওপরে চলাচল করে। তবে কিছু ব্যক্তিগত জেটকে এর চেয়েও অনেক বেশি উচ্চতায় উড়তে দেখা যায়। এর পেছনে শুধু বিমানের আকার ছোট হওয়া বা কম যাত্রী বহন করার বিষয়টি কাজ করে না। বরং বিমানের নকশা, ওজন, ইঞ্জিনের ক্ষমতা, আবহাওয়া এবং আকাশপথ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাসহ বেশ কয়েকটি বিষয় এর সঙ্গে জড়িত।

কিছু ব্যক্তিগত জেটকে শুরু থেকেই অনেক বেশি উচ্চতায় ওড়ার উপযোগী করে তৈরি করা হয়। যেমন গালফস্ট্রিম জি৭০০-এর মতো জেট অত্যন্ত উঁচুতে চলাচলের জন্য নকশা করা হয়েছে। কিছু ব্যক্তিগত জেটকে ৪৫ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায় উড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আবার কয়েকটি জেট সর্বোচ্চ ৫১ হাজার ফুট পর্যন্ত উঠতে পারে।

অন্যদিকে, যাত্রীবাহী বাণিজ্যিক বিমান ভিন্ন ধরনের চাহিদা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়। এসব বিমানে প্রতিটি যাত্রায় বিপুলসংখ্যক যাত্রী, লাগেজ এবং পণ্য বহন করতে হয়। ফলে বিমানের ওজন ও পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতাও ভিন্ন হয়। এ কারণে অনেক যাত্রীবাহী বিমান ব্যক্তিগত জেটের তুলনায় কিছুটা কম উচ্চতায় দীর্ঘ সময় ধরে উড়ে।

তবে বেশি উচ্চতায় ওঠার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যত ওপরে ওঠা যায়, বাতাস তত পাতলা হয়ে আসে। পাতলা বাতাস বিমানের উড্ডয়নক্ষমতা, ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা এবং বায়ুরোধের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতার পর আরও ওপরে ওঠা আর বাস্তবসম্মত থাকে না।

প্রতিটি বিমানেরই একটি নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ উড্ডয়নসীমা রয়েছে। বাতাস যত পাতলা হয়, সেই পরিবেশে বিমান কতটা কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে, তার ওপর ভিত্তি করেই এই সীমা নির্ধারিত হয়। তাই কোনও বিমান দেখতে ছোট বা শক্তিশালী মনে হলেই সেটি ইচ্ছামতো যেকোনো উচ্চতায় উঠতে পারে না।

বেশি উচ্চতায় ওড়ার আরেকটি সুবিধা হলো জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা। উঁচুতে বাতাস তুলনামূলক ঠান্ডা ও পাতলা হওয়ায় জেট ইঞ্জিন অনেক ক্ষেত্রে আরও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে। দীর্ঘ যাত্রায় সঠিক উচ্চতায় উড়লে জ্বালানি সাশ্রয় এবং বিমানের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়।

তবে সবচেয়ে বেশি উচ্চতাই যে সব সময় সবচেয়ে কার্যকর, তা নয়। বিমানের ওজন, বাতাসের গতি ও দিক, আবহাওয়া এবং নির্ধারিত উড্ডয়নপথের ওপর নির্ভর করে কোন উচ্চতায় বিমান সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে চলবে। তাই একই ধরনের বিমানও ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন উচ্চতায় উড়তে পারে।

৪১ হাজার ফুটের ওপরে উড়ার ক্ষেত্রেও কিছু অতিরিক্ত নিয়ম প্রযোজ্য হয়। এ ধরনের উচ্চতায় বিমান চলাচলের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে কম হলেও নিরাপত্তার জন্য বিমানগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট উল্লম্ব দূরত্ব বজায় রাখা হয়। আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী বিমানের উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়।

কোনও ব্যক্তিগত জেট সর্বোচ্চ ৫১ হাজার ফুট পর্যন্ত উঠতে সক্ষম হলেও, সেটি প্রতিটি যাত্রায় ওই উচ্চতায় উড়বে এমন নয়। সেদিনের আবহাওয়া, আকাশপথের ব্যস্ততা, নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এবং বিমানের নিজস্ব পরিচালনাগত সীমা বিবেচনা করেই চূড়ান্ত উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়।

আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, ব্যক্তিগত জেট মানেই যাত্রীবাহী বিমানের চেয়ে বেশি উচ্চতায় উড়বে। বাস্তবে তা নয়। বোয়িং ও এয়ারবাসের অনেক যাত্রীবাহী বিমানও ৪০ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায় চলাচল করতে সক্ষম। কোনও ব্যক্তিগত জেট যদি আশপাশের যাত্রীবাহী বিমানের চেয়ে বেশি উচ্চতায় উড়ে, তার পেছনে মূলত ওই নির্দিষ্ট বিমানের নকশা, ওজন, ইঞ্জিনের ক্ষমতা ও পরিচালনাগত বৈশিষ্ট্য কাজ করে।

অর্থাৎ, ব্যক্তিগত জেট বেশি উচ্চতায় উড়তে পারে বলেই যে সব সময় সেখানে উড়বে, এমন নয়। বরং প্রতিটি ফ্লাইটে নিরাপত্তা, দক্ষতা, আবহাওয়া, উড্ডয়নপথ এবং আকাশপথ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা বিবেচনা করেই উপযুক্ত উচ্চতা বেছে নেওয়া হয়। এ কারণেই আকাশে পাশাপাশি উড়তে থাকা দুটি বিমানের উচ্চতায় পার্থক্য দেখা গেলেও তার পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট বৈমানিক ও পরিচালনাগত কারণ।