ভ্রমণের আনন্দে টাকার হিসাব যেন না হয় বিষাদ

বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার আনন্দই আলাদা। একসঙ্গে নতুন জায়গা দেখা, পছন্দের খাবার খাওয়া কিংবা হঠাৎ কোনও পরিকল্পনা করে ফেলা এসব ছোট ছোট বিষয়েই স্মরণীয় হয়ে ওঠে ভ্রমণ। তবে এই আনন্দে ছেদ পড়তে পারে টাকার হিসাব নিয়ে। কে কত খরচ করলেন, কার হয়ে কে টাকা দিলেন, পরে কে কাকে কত ফেরত দেবেন এসব পরিষ্কার না থাকলে ছোটখাটো বিষয়ও বড় ধরনের মনোমালিন্যে রূপ নিতে পারে। তাই দলবদ্ধ ভ্রমণে যাওয়ার আগে যেমন স্থান ঠিক করা জরুরি, তেমনি জরুরি খরচের বিষয়টিও আগেই পরিষ্কার করে নেওয়া।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছয় বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া ভ্রমণে গিয়েছিলেন আরিফ ইসলাম। দুই সপ্তাহের সেই ভ্রমণে সবাই নগদ টাকা খরচ করছিলেন। কিন্তু কে কখন কত টাকা খরচ করছেন, তার কোনও হিসাব রাখা হয়নি। রাস্তার খাবার, কেনাকাটা, দলবদ্ধ ম্যাসাজ কিংবা টুকটুকের ভাড়ার মতো ছোট-বড় খরচ একসময় মিলেমিশে যায়। তারা ভেবেছিলেন, ভ্রমণ শেষে বসে সব হিসাব মিটিয়ে নেবেন।

কিন্তু ভ্রমণ শেষে দেখা গেলো, কে কত টাকা খরচ করেছেন, তা কারও ঠিক মনে নেই। হিসাব মেলাতে গিয়ে শুরু হয় তুমুল তর্ক। এক বন্ধু মনে করেছিলেন, অন্যদের কাছে তার ২০০ ডলারেরও বেশি পাওনা রয়েছে। কিন্তু কোনও রসিদ না থাকায় এবং কে কোথায় কত খরচ করেছেন, তা নিয়ে সবার স্মৃতি এক না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ওই পাওনা পরিশোধ করা হয়নি।

বন্ধুদের সঙ্গে ছুটি কাটানো, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়া কিংবা বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত কোনও দলবদ্ধ ভ্রমণে অর্থের হিসাব থেকেই তৈরি হতে পারে অস্বস্তি। তাই ভ্রমণের আনন্দ অটুট রাখতে শুরু থেকেই কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।

ভ্রমণের আগে টাকার কথাটাই আগে বলুন

দলবদ্ধ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো যাত্রার আগে খরচের বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা না করা। মোটামুটি কত টাকা খরচ হতে পারে, কে কতটা ব্যয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং একজনের হয়ে অন্য কেউ টাকা দিলে পরে কীভাবে তা ফেরত দেওয়া হবে এসব বিষয় আগে থেকেই ঠিক করে নেওয়া ভালো।

নিউইয়র্কের অর্থবিষয়ক মনোবিশেষজ্ঞ ও মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শদাতা আজা ইভান্সের মতে, শুরুতেই অর্থের কথা বলা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর। কারণ এতে কেউ হয়তো নিজের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা প্রকাশ করতে বাধ্য হতে পারেন। আবার বন্ধুরা কী ভাববেন, সেই চিন্তাও কাজ করে।

বন্ধুত্ববিষয়ক পরামর্শদাতা ড্যানিয়েল বেয়ার্ড জ্যাকসনের মতে, ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা অনেক সময় ধরে নেন যে একে অপরের পছন্দ-অপছন্দ ও সামর্থ্য সম্পর্কে তারা এমনিতেই জানেন। ফলে ভ্রমণের আগে বিস্তারিত আলোচনা আর প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে সবার খরচের সামর্থ্য ও ভ্রমণের প্রত্যাশা এক রকম নাও হতে পারে।

বিশেষ করে অর্থের বিষয়টি সামনে এলে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। কেউ বন্ধুর চেয়ে বেশি আয় করেন, কেউ কম। সেই পার্থক্যের কারণে বন্ধুরা যেন তাকে অন্যভাবে না দেখেন এমন আশঙ্কা থেকেও অনেকে অর্থ নিয়ে সরাসরি কথা বলতে চান না।

বাজেট আগে ঠিক করুন

আপনার ভ্রমণের বাজেট যদি নির্দিষ্ট থাকে, তাহলে সেটি শুরুতেই বন্ধুদের জানিয়ে দিন। নিজের অন্যান্য আর্থিক দায়িত্ব বা সামনে থাকা খরচের কথাও প্রয়োজনে বলতে পারেন। এতে অন্যরা বুঝতে পারবেন, আপনি ইচ্ছা করে কম খরচ করতে চাইছেন না, বরং আপনার আর্থিক পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে হচ্ছে।

জ্যাকসনের মতে, ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার থাকলে কোথায় যাওয়া হবে, কতটা খরচ করা হবে এবং কারা এই ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত সঙ্গী হবেন এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

সবার পছন্দ এক হবে, এমন নয়

দলবদ্ধ ভ্রমণে আরেকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি, একই দলের সবার অর্থ খরচের অভ্যাস এক রকম নয়। তাই ভ্রমণের সঙ্গীদের সামর্থ্য ও পছন্দ সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা নেওয়া ভালো। কেউ বিলাসবহুল হোটেল চান, আবার কেউ সাধারণ আবাসনেই স্বচ্ছন্দ। কেউ প্রতিদিন রেস্তোরাঁয় খেতে চান, অন্যজন স্থানীয় খাবারের দোকান পছন্দ করতে পারেন। এসব পার্থক্যকে আগে থেকেই হিসাবের মধ্যে রাখলে ভ্রমণের সময় সমস্যা কম হয়।

কারও হয়ে টাকা দিলে আগে ভাবুন

দলের কারও কাছে টাকা না থাকায় আপনি হয়তো তার হয়ে বিল পরিশোধ করলেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি সময়মতো টাকা ফেরত দেন কি না, সে বিষয়ে যদি আপনার সন্দেহ থাকে, তাহলে আগে থেকেই বিষয়টি বিবেচনা করুন।

চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শদাতা ট্রেসি উইলিয়ামসের মতে, এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার ওই টাকা শেষ পর্যন্ত ফেরত না পেলেও আপনি তা মেনে নিতে পারবেন কি না।

অন্যদিকে, যারা হিসাব করে খরচ করতে চান, তাদের নিজের একটি আর্থিক সীমা ঠিক করে নেওয়া উচিত। দলের অন্যরা যে পরিমাণ অর্থ খরচ করতে চান, তা যদি আপনার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, তাহলে ভ্রমণে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি নতুন করে ভাবা ভালো।

ভ্রমণ শেষে টাকা না পেলে কী করবেন

ভ্রমণ শেষ হয়েছে। যার যার পাওনা হিসাবও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও কেউ টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। এমনকি একবার মনে করিয়ে দেওয়ার পরও সাড়া নেই। এ অবস্থায় সরাসরি রাগ দেখানোর বদলে শান্তভাবে কথা বলাই ভালো।

চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শদাতা ট্রেসি উইলিয়ামসের পরামর্শ, প্রথমেই ইতিবাচক কোনও কথা দিয়ে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। যেমন, একসঙ্গে কাটানো সময়টি ভালো লেগেছে, এমন কথা বলার পর ধীরে ধীরে পাওনা টাকার প্রসঙ্গে আসা যায়।

এরপর কেন টাকাটি ফেরত পাওয়া আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা জানাতে পারেন। সামনে কোনও বিল পরিশোধ করতে হবে, অথবা অন্য কোনও প্রয়োজনের জন্য টাকা জমাতে হচ্ছে এমন বিষয় থাকলে সেটিও বলা যেতে পারে। এতে কথাটি অভিযোগের মতো না শোনিয়ে সহযোগিতার অনুরোধ হিসেবে পৌঁছাতে পারে।

তবে পাওনা টাকা না পেলেও পুরো বিষয়টি চেপে যাওয়াও ঠিক নয়। বন্ধুত্বের কথা ভেবে তখন কিছু না বললে পরে মনে ক্ষোভ জমতে পারে।

জ্যাকসনের মতে, অনেক সময় মানুষ চুপ করে থেকে ধরে নেন, অন্য ব্যক্তি ইচ্ছা করেই টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। এরপর সেই একটি ঘটনাকে ওই ব্যক্তির চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে শুরু করেন। তাই অনুমান না করে বিষয়টি সরাসরি ও শান্তভাবে আলোচনা করাই ভালো।

হিসাব রাখুন, ঝামেলাও কমবে

দলবদ্ধ ভ্রমণে কে কত খরচ করলেন, তার হিসাব রাখার জন্য মুঠোফোনে ব্যবহার করা যায় এমন বেশ কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। ট্যাব, স্প্লিটওয়াইজ, ট্রাভেলস্পেন্ড, স্প্লিড, ট্রাইকাউন্ট ও কিটিস্প্লিটের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে দলবদ্ধ খরচের হিসাব রাখা যায়। কেউ কেউ আবার একাধিক ব্যবস্থা একসঙ্গে ব্যবহার করেন। এতে ভ্রমণ শেষে কে কত টাকা দেবেন বা পাবেন, তা হিসাব করা সহজ হয়।

দলবদ্ধ ভ্রমণের আসল উদ্দেশ্য আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। সেই আনন্দ যেন শেষ পর্যন্ত টাকার হিসাবের কারণে তিক্ত হয়ে না যায়, সে জন্য ভ্রমণের আগেই বাজেট, খরচের ধরন ও পাওনা পরিশোধের নিয়ম নিয়ে পরিষ্কার কথা বলাই বুদ্ধিমানের কাজ।