সবুজের গভীরে লুকিয়ে থাকা লাউয়াছড়ার পথে মিলবে বিপন্ন উল্লুকের ডাক

শহরের কোলাহল থেকে কয়েক ঘণ্টার পথ পেরোলেই বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। চায়ের বাগানের সবুজ পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় এমন এক বনে, যেখানে মাথার ওপর ঘন গাছের ছাউনি, চারপাশে পাখির ডাক আর সরু পথে হাঁটতে হাঁটতে দেখা মিলতে পারে নানা বন্যপ্রাণীর। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এমনই এক আকর্ষণীয় গন্তব্য।

১৯৯৬ সালের ৭ জুলাই জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত লাউয়াছড়া পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের অংশ। প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই বনে রয়েছে আধা-চিরহরিৎ ও মিশ্র বনাঞ্চল। সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, এখানে ৪৬০টিরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ, পাখি, স্তন্যপায়ী ও সরীসৃপের দেখা মেলে।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান (ছবি: পিক্সেল)

বনের পথে হাঁটলেই প্রকৃতির অন্য রূপ

লাউয়াছড়ার অন্যতম আকর্ষণ এর জঙ্গল ট্রেইল। ঘন সবুজের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখনও দেখা মিলতে পারে বানর, হরিণ কিংবা নানা প্রজাতির পাখির। তবে এই বনের সবচেয়ে পরিচিত বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছে বিপন্ন উল্লুক। ভোরের দিকে বনের গাছের ওপর থেকে তাদের ডাক শোনা বা গাছের ডালে চলাফেরা দেখতে পাওয়া ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে।

বনে হাঁটার জন্য বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের ট্রেইলও রয়েছে। বন বিভাগের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা ও প্রায় তিন ঘণ্টার হাঁটার পথের উল্লেখ রয়েছে। কিছু পথে স্থানীয় খাসিয়া জনগোষ্ঠীর বসতিও দেখা যায়।

শ্রীমঙ্গল থেকে খুব কাছেই

লাউয়াছড়া ভ্রমণের সবচেয়ে সহজ ঘাঁটি হতে পারে শ্রীমঙ্গল। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে উদ্যানটি প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে। ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে শ্রীমঙ্গল গিয়ে সেখান থেকে সিএনজি, টেম্পো বা গাড়িতে লাউয়াছড়ায় যাওয়া যায়।

এখানে ৪৬০টিরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ, পাখি, স্তন্যপায়ী ও সরীসৃপ প্রাণী রয়েছে (ছবি: পিক্সেল)

একই ভ্রমণে লাউয়াছড়ার সঙ্গে শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান, মাধবপুর লেক কিংবা স্থানীয় পর্যটন আকর্ষণগুলোও ঘুরে দেখা যায়। ফলে একদিন বা দুদিনের ভ্রমণ পরিকল্পনায় জায়গাটি সহজেই রাখা যায়।

কখন গেলে বনের সৌন্দর্য বেশি উপভোগ করবেন

শীত ও শুষ্ক মৌসুমে বনের পথে হাঁটা তুলনামূলক আরামদায়ক। বিশেষ করে সকালে গেলে পরিবেশ থাকে শান্ত এবং বন্যপ্রাণীর চলাচল দেখার সম্ভাবনাও বাড়ে। সাম্প্রতিক একটি ভ্রমণ নির্দেশিকায় সকাল ৬টা থেকে ৮টার সময়টিকে উল্লুকসহ বন্যপ্রাণী দেখার জন্য উপযোগী বলা হয়েছে।

এই বনে রয়েছে আধা-চিরহরিৎ ও মিশ্র বনাঞ্চল (ছবি: বাংলা ট্রিবিউন কোলাজ)

বর্ষায় লাউয়াছড়া আরও সবুজ হয়ে উঠলেও তখন বনের পথ কাদাময় ও পিচ্ছিল হতে পারে। জোঁকের উপদ্রবও বাড়তে পারে। তাই বর্ষায় গেলে বন্ধ জুতা, প্রয়োজনীয় পোশাক ও পোকামাকড় প্রতিরোধক সঙ্গে রাখা ভালো।

ভ্রমণে মনে রাখবেন

লাউয়াছড়া শুধু বেড়ানোর জায়গা নয়, এটি বন্যপ্রাণী ও বনজ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। তাই বনের ভেতরে শব্দ কম করা, প্রাণীদের খাবার না দেওয়া, তাদের কাছে না যাওয়া এবং নির্ধারিত পথেই হাঁটা জরুরি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে পর্যটকের চাপ ও আশপাশের অবকাঠামো নিয়ে সংরক্ষণ-সংক্রান্ত উদ্বেগের কথাও উঠে এসেছে।

সবুজের গভীরে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে চাইলে লাউয়াছড়া হতে পারে চমৎকার একটি গন্তব্য। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের সৌন্দর্যের সঙ্গে বনের নীরবতা ও বন্যপ্রাণীর অভিজ্ঞতা যোগ করতে চাইলে এই জাতীয় উদ্যান ভ্রমণের তালিকায় রাখা যায়।