উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি পথে নৈনিতাল থেকে এগিয়ে গেলে হঠাৎই চোখে পড়ে শান্ত, সবুজে ঘেরা এক ছোট্ট জনপদ কৈঞ্চি। পাহাড়, জঙ্গল আর নিরিবিলি পরিবেশের মাঝে অবস্থিত কৈঞ্চি ধাম আশ্রম বহু মানুষের কাছে একটি আধ্যাত্মিক শান্তি ও আত্মঅনুসন্ধানের বিশেষ স্থান।
নিম করোলি বাবা, ভক্তদের কাছে যিনি মহারাজজি নামে পরিচিত, তাঁর স্মৃতি ও শিক্ষাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই আশ্রমে বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিড় করেন দেশ-বিদেশের মানুষ। তাঁদের মধ্যে যেমন সাধারণ ভক্ত ও পর্যটক রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন প্রযুক্তি ও ব্যবসা জগতের একাধিক পরিচিত মুখ।
স্টিভ জবস, মার্ক জাকারবার্গ, ল্যারি পেজ থেকে শুরু করে বিরাট কোহলি ও অনুষ্কা শর্মা কৈঞ্চি ধামে তাঁদের উপস্থিতি এই পাহাড়ি আশ্রমকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও আধ্যাত্মিকতার আলোচনায় এনে দিয়েছে।
সম্প্রতি নিম করোলি বাবার জীবন ও শিক্ষাকে অনুপ্রাণিত করে নির্মিত ‘হনুমান অংশ’ সিনেমাটিও আলোচনায় এসেছে। সিনেমাটি ভারতে ১২০ কোটি রুপির বেশি আয় করেছে। ফলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর কৈঞ্চি ধাম।
১৯ বছর বয়সে কৈঞ্চি ধামে স্টিভ জবস
কৈঞ্চি ধামের সঙ্গে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা স্টিভ জবসের নাম দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।
১৯৭৪ সালে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে, জবস আধ্যাত্মিক গুরুর সন্ধানে ভারতে আসেন। কয়েক মাস তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান, এমনকি অনেকটা পথ খালি পায়ে ভ্রমণ করেন। তাঁর আগ্রহ ছিল এমন একজন আধ্যাত্মিক শিক্ষকের সন্ধান করা, যিনি তাঁকে জীবনের অর্থ ও নিজের অন্তর্জগতকে বুঝতে সাহায্য করতে পারেন।
তাঁর সেই যাত্রার অন্যতম উল্লেখযোগ্য গন্তব্য ছিল নিম করোলি বাবার কৈঞ্চি ধাম আশ্রম। যদিও জবসের সঙ্গে নিম করোলি বাবার সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি, আশ্রমে তাঁর অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়াল্টার আইজ্যাকসনের লেখা জবসের অনুমোদিত জীবনীতে তাঁর ভারত সফর এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের বিষয়টি উঠে এসেছে। জবসের চিন্তাধারা ও জীবনের দর্শন বোঝার ক্ষেত্রে এই ভারত সফরকে তাই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়।
জবসের পর কৈঞ্চি ধামে মার্ক জাকারবার্গ
প্রায় চার দশক পর কৈঞ্চি ধামে আসেন আরেক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মার্ক জাকারবার্গ।
২০১৫ সালে ফেসবুকের কঠিন এক সময়ে জাকারবার্গ ভারতে আসেন। তাঁর এই সফরের সঙ্গে কৈঞ্চি ধামের নামও জড়িয়ে আছে। জানা যায়, স্টিভ জবস তাঁকে এই আশ্রমে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে ভারত সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জাকারবার্গ জানান, এই যাত্রা তাঁকে ফেসবুকের শুরুর উদ্দেশ্য ও দর্শনের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনে সাহায্য করেছিল।
অর্থাৎ, কৈঞ্চি ধামের গল্পটি আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে বিশ্বের প্রযুক্তি জগতের দুই প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোক্তার ভারত-অনুসন্ধানের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
ল্যারি পেজ, জেফরি স্কলও এসেছেন এখানে
কৈঞ্চি ধামে আসা বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকা এখানেই শেষ নয়।
গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ, ইবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জেফরি স্কল এবং চিকিৎসক ড. ল্যারি ব্রিলিয়ান্টও এই আশ্রমে এসেছেন।
ল্যারি ব্রিলিয়ান্ট একসময় কৈঞ্চি ধামে বসবাসও করেছেন। পরে তিনি গুগলের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন। আশ্রম সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি একে এমন একটি জায়গা হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন, যেখানে মানুষ নিজেকে জানার পাশাপাশি পৃথিবীকে পরিবর্তনের ভাবনাও খুঁজে পেতে পারে।
বিরাট-অনুষ্কার কৈঞ্চি ধাম সফর
শুধু প্রযুক্তি উদ্যোক্তা নন, ভারতীয় বিনোদন ও ক্রীড়া জগতের তারকারাও কৈঞ্চি ধামে এসেছেন।
২০২২ সালের নভেম্বরে বিরাট কোহলি ও অনুষ্কা শর্মা উত্তরাখণ্ডের এই আশ্রমে যান। তাঁদের সফরের ছবি ও খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর কৈঞ্চি ধামকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়।
নিম করোলি বাবার শিক্ষা ও আশ্রমের পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শান্তি, ভক্তি এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার অনুভূতিই অনেক দর্শনার্থীকে এখানে টেনে আনে।
কেন এত মানুষ আসেন কৈঞ্চি ধামে?
কৈঞ্চি ধামে আসার কারণ সবার কাছে এক নয়। কেউ আসেন ভক্তি থেকে, কেউ আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে, আবার কেউ পাহাড়ের নির্জন পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে।
ভক্তদের অনেকেই আশ্রমের পরিবেশকে শান্ত ও আধ্যাত্মিকভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক বলে মনে করেন। পরিচিতজনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নিম করোলি বাবাকে ঘিরে ছড়িয়ে থাকা নানা গল্পও নতুন দর্শনার্থীদের আগ্রহী করে তোলে।
তবে কৈঞ্চি ধামের আকর্ষণ শুধু বিখ্যাত ব্যক্তিদের সফরে সীমাবদ্ধ নয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা প্রান্ত এবং বিদেশ থেকেও সাধারণ মানুষ এখানে আসেন।
কোথায় এই কৈঞ্চি ধাম?
উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন পাহাড়ে অবস্থিত কৈঞ্চি ধাম নৈনিতাল থেকে সড়কপথে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে। পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা এই আশ্রমের পরিবেশ শহুরে কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
নৈনিতাল, হালদোয়ানি ও কাঠগোদাম থেকে সড়কপথে কৈঞ্চি ধামে যাওয়া যায়। পথে কুমায়ুনের পাহাড়ি প্রকৃতির সৌন্দর্য ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
ট্রেনে গেলে
কাঠগোদাম হলো নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন। ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর থেকে ট্রেনে কাঠগোদাম পৌঁছে সেখান থেকে ট্যাক্সি বা স্থানীয় পরিবহনে কৈঞ্চি ধামে যাওয়া যায়।
বিমানে গেলে
নিকটতম বিমানবন্দর পন্তনগর বিমানবন্দর, যা কৈঞ্চি ধাম থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে। বিমানবন্দর থেকে ক্যাব নিয়ে সরাসরি আশ্রমে পৌঁছানো যায়।
কখন যাবেন?
কৈঞ্চি ধাম ভ্রমণের জন্য মার্চ থেকে জুন এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর সময়টিকে তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক ধরা হয়। এ সময় পাহাড়ি আবহাওয়া সাধারণত মনোরম থাকে।
অন্যদিকে জুলাই ও আগস্টে বর্ষার কারণে পাহাড়ি পথে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও যাতায়াতের অসুবিধা হতে পারে। তাই বর্ষাকালে ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে আবহাওয়া ও রাস্তার সর্বশেষ পরিস্থিতি জেনে নেওয়া ভালো।
জুনে ভাণ্ডারা, ভক্তদের বড় সমাগম
কৈঞ্চি ধামের অন্যতম উল্লেখযোগ্য আয়োজন হলো জুন মাসের বার্ষিক ভাণ্ডারা। এ সময় হাজার হাজার ভক্তের সমাগম হয়। ফলে এই সময় আশ্রম ও আশপাশের এলাকায় ভিড়ও বেড়ে যায়।
যাঁরা তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশে আশ্রমটি দেখতে চান, তাঁদের ভ্রমণের সময় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি মাথায় রাখা ভালো।
আশ্রমের সময় ও দর্শনার্থীদের জন্য তথ্য
আশ্রম সাধারণত সকালে খোলে এবং দিনের শেষ প্রার্থনার পর সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যায়। ঋতুভেদে সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, বর্তমানে আশ্রমে রাতভর সৎসঙ্গের জন্য দর্শনার্থীদের আমন্ত্রণ জানানো হয় না। আশ্রমের সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত কোনও টেলিফোন নম্বর বা ই-মেইল ঠিকানাও নেই।
তাই কৈঞ্চি ধামে যাওয়ার আগে বর্তমান দর্শন-ব্যবস্থা ও সময়সূচি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেওয়াই ভালো।
পাহাড়ের পথে একটি আধ্যাত্মিক ঠিকানা
কৈঞ্চি ধামের গল্পে বিশ্বখ্যাত মানুষের উপস্থিতি অবশ্যই একটি আকর্ষণীয় অধ্যায়। তবে এই পাহাড়ি আশ্রমের আসল আকর্ষণ সম্ভবত তার নিরিবিলি পরিবেশ, নিম করোলি বাবাকে ঘিরে থাকা আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং প্রতিদিন এখানে আসা অসংখ্য সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে।
তাই উত্তরাখণ্ড ভ্রমণের তালিকায় নৈনিতাল থাকলে, কাছে থাকা কৈঞ্চি ধামে পাহাড়, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিতে পারেন।