২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হয়েছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। এ উপলক্ষে বৈশ্বিক পর্যটনের বর্তমান চিত্র ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পর্যটন খাতের বিকাশ, অবকাঠামো, প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদসহ বিভিন্ন সূচকে কোন দেশগুলো এগিয়ে, সেই চিত্র উঠে এসেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ২০২৬ সালের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে।
সূচকটিতে পর্যটন বিকাশের অনুকূল পরিবেশ, ভ্রমণ ও পর্যটনসম্পদ, অবকাঠামো এবং টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় বিশ্বের ১১০টি অর্থনীতিকে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
ডব্লিউইএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ১৫০ কোটিতে পৌঁছায়, যা মহামারির আগের সময়ের তুলনায় ৪.৪ শতাংশ বেশি। সূচকে শীর্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে কেউ এগিয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির কারণে, কেউ আবার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উন্নত অবকাঠামো কিংবা বৈচিত্র্যময় পর্যটন অভিজ্ঞতার জন্য। সেরা ১০ দেশ হলো-
১. জাপান: ২০২৬ সালের সূচকে দুই ধাপ এগিয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছে জাপান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে রেকর্ড ৪ কোটি ২৭ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। আধুনিক নগরজীবন, প্রাচীন ঐতিহ্য, প্রযুক্তি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধন জাপানের অন্যতম আকর্ষণ।
জাপান ভ্রমণে টোকিও, ওসাকা, হিরোশিমা ও মাউন্ট ফুজি পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় থাকে।
২. যুক্তরাষ্ট্র: আগের সংস্করণে শীর্ষে থাকাফিচার ডেস্ক।
বিশাল আয়তনের এই দেশে একদিকে যেমন রয়েছে নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলসের মতো ব্যস্ত এবং আধুনিক শহর, অন্যদিকে রয়েছে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ও ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের মতো প্রাকৃতিক বিস্ময়।
শহর, জাতীয় উদ্যান, ঐতিহাসিক স্থান ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন আকর্ষণও ব্যাপক।
৩. স্পেন: তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে স্পেন। বার্সেলোনা ও মাদ্রিদ দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। ঐতিহাসিক স্থাপনা, অনন্য স্থাপত্য, সমুদ্রসৈকত এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পর্যটকদের স্পেনের দিকে টানে।
ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সৌন্দর্য এবং প্রাণবন্ত শহুরে জীবনও দেশটির পর্যটন আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
৪. অস্ট্রেলিয়া: আগের অবস্থান থেকে দুই ধাপ এগিয়ে চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে অস্ট্রেলিয়া।
দেশটির পর্যটনের বড় আকর্ষণ হলো বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকত, বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক দৃশ্য। শহুরে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ অস্ট্রেলিয়াকে আলাদা করে তুলেছে।
৫. ফ্রান্স: তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে ফ্রান্স। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস বিশ্বের অন্যতম পরিচিত পর্যটন শহর। আইফেল টাওয়ার ও লুভর মিউজিয়াম দেশটির সবচেয়ে পরিচিত আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে।
শিল্প, সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও দীর্ঘ ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের কারণে ফ্রান্স আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়।
৬. জার্মান: ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে জার্মানি। রাজধানী বার্লিন এবং মিউনিখ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ নগর পর্যটনকেন্দ্র। ইতিহাস ও স্থাপত্যের পাশাপাশি আধুনিক শহুরে জীবন, সংস্কৃতি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় পর্যটন আকর্ষণ জার্মানিকে ভ্রমণকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
৭. যুক্তরাজ্য: সূচকে সপ্তম স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটির সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক পর্যটন আকর্ষণগুলোর একটি লন্ডন। পাশাপাশি স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডও পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়।
রাজকীয় ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমন্বয় যুক্তরাজ্যের পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করেছে।
৮. চীন: অষ্টম স্থানে রয়েছে চীন। ডব্লিউইএফ-এর শীর্ষ ১০-এর মধ্যে চীনই একমাত্র দেশ, যাকে উন্নত অর্থনীতি হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি।
দেশটির পর্যটন আকর্ষণের তালিকা দীর্ঘ। এর মধ্যে রয়েছে গ্রেট ওয়াল অব চায়না, বেইজিংয়ের ফরবিডেন সিটি এবং সাংহাইয়ের আধুনিক স্কাইলাইন।
হাজার বছরের ইতিহাস, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং আধুনিক নগরজীবনের কারণে চীনকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
৯. সুইজারল্যান্ড: তালিকার নবম স্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। দেশটির পর্যটনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে আল্পস পর্বতমালা। বিশেষ করে শীতকালে স্কিইংসহ বিভিন্ন ধরনের পাহাড়ি ক্রীড়া পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
বরফে ঢাকা পাহাড়, মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগ সুইজারল্যান্ডকে ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
১০. ইতালি: শীর্ষ দশের শেষ অবস্থানে রয়েছে ইতালি। দেশটির পর্যটন আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে রোমের ঐতিহাসিক স্থাপনা, ভেনিসের খাল, ফ্লোরেন্সের শিল্প ও ঐতিহ্য এবং আমালফি কোস্ট।
প্রাচীন ইতিহাস, শিল্প, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও উপকূলীয় সৌন্দর্যের বৈচিত্র্য ইতালিকে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে।
ইতিহাস থেকে প্রকৃতি—বৈচিত্র্যেই শীর্ষ দেশগুলোর শক্তি
ডব্লিউইএফ-এর এই তালিকায় থাকা দেশগুলোর পর্যটন অভিজ্ঞতা একে অন্যের চেয়ে বেশ আলাদা। কোথাও মূল আকর্ষণ হাজার বছরের ইতিহাস ও স্থাপত্য, কোথাও পাহাড়-সমুদ্র ও বন্যপ্রাণী, আবার কোথাও আধুনিক শহর ও উন্নত পর্যটন অবকাঠামো।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক পর্যটনের বিকাশে শুধু দর্শনীয় স্থানই নয়, পর্যটনবান্ধব পরিবেশ, যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।