মেঘ-পাহাড়ের রাজ্যে রহস্যময় জলাধার খাগড়াছড়ির দেবতা পুকুর

খাগড়াছড়ি জেলায় পাহাড়, মেঘ আর সবুজের সৌন্দর্যের মাঝে এমন কিছু স্থান আছে, যেখানে পৌঁছাতে যেমন পরিশ্রম করতে হয়, তেমনি গন্তব্যে গিয়ে সেই পরিশ্রমের পুরস্কারও মেলে চোখজুড়ানো প্রকৃতিতে। তেমনই এক জায়গা দেবতা পুকুর। পাহাড়ের অনেকটা ওপরে, সবুজে ঘেরা পরিবেশের মাঝে স্বচ্ছ পানির এই পুকুর যেন প্রকৃতির এক বিস্ময়। খাগড়াছড়ি ভ্রমণে একটু হাঁটা ও পাহাড়ি পথের রোমাঞ্চ উপভোগ করতে চাইলে দেবতা পুকুরকে আপনার ভ্রমণ তালিকায় রাখতে পারেন।

পাহাড়ের ওপরে পুকুর, চারপাশে সবুজ

খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের নুনছড়ি এলাকায় দেবতা পুকুরের অবস্থান। জেলা সদর থেকে এটি প্রায় ১১-১২ কিলোমিটার দূরে। মূল সড়ক থেকে নুনছড়ি এলাকার দিকে এগিয়ে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে যেতে হয় পুকুরের কাছে। এরপর শুরু হয় হাঁটার পথ। পাড়ার কাছ থেকে সিঁড়ি বেয়ে প্রায় ৪০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা হাঁটলেই দেখা মেলে এই পুকুরের।

পথটিও ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। পাহাড়ের ঢালে সবুজ গাছপালা, ঝরনার শব্দ, পাখির ডাক আর দূরে মেঘে ঢাকা পাহাড় হাঁটার ক্লান্তির মধ্যেও চারপাশের প্রকৃতি মন ভালো করে দিতে পারে। কোথাও ছায়াঘেরা সিঁড়ি, কোথাও পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই শুরু হয়ে যায় প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের পরিচয়।

নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লোকবিশ্বাস

দেবতা পুকুরের স্থানীয় নাম মাতাই পুখিরি। ত্রিপুরা ভাষায় ‘মাতাই’ অর্থ দেবতা এবং ‘পুখিরি’ অর্থ পুকুর। স্থানীয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কাছে জায়গাটি ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পুকুরের পানি কখনও শুকিয়ে যায় না এবং এর সঙ্গে দেবতার আশীর্বাদের সম্পর্ক রয়েছে। এসব বিশ্বাস ও লোককথা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জায়গাটিকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে।

দেবতা পুকুরকে ঘিরে রয়েছে আরও নানা লোককথা। তবে এসব কাহিনিকে স্থানীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত গল্প হিসেবেই দেখা উচিত। জায়গাটির প্রকৃত আকর্ষণ হলো পাহাড়ের চূড়ায় এমন একটি জলাধারের অবস্থান এবং তাকে ঘিরে থাকা শান্ত, সবুজ পরিবেশ।

তীর্থস্থানও এই পুকুর

দেবতা পুকুর পর্যটকদের কাছে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তিতে এখানে ধর্মীয় আয়োজন ও তীর্থমেলা বসে। এ সময় বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন।

পুকুরের আশপাশের পাহাড়, বন আর নিরিবিলি পরিবেশ ভ্রমণকারীদের জন্য তৈরি করে অন্যরকম আবহ। পানির স্বচ্ছতা, চারপাশের সবুজ আর পাহাড়ের উচ্চতা মিলিয়ে এখানে কিছু সময় চুপচাপ বসে থাকাও হয়ে উঠতে পারে ভ্রমণের অন্যতম সুন্দর অভিজ্ঞতা।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়কপথে খাগড়াছড়ি পৌঁছে জেলা শহর থেকে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়ক ধরে মাইসছড়ির দিকে যেতে হবে। মাইসছড়ি থেকে নুনছড়ি এলাকার দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। স্থানীয়ভাবে গাড়ি ভাড়া করে নুনছড়ি পর্যন্ত যাওয়া যায়। এরপর পাহাড়ের ওপরের অংশে পৌঁছাতে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে উঠতে হবে।

দেবতা পুকুরে যাওয়ার ক্ষেত্রে হাঁটার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি। পাহাড়ি সিঁড়ি ও উঁচুনিচু পথ পাড়ি দিতে হয় বলে বয়স্ক ব্যক্তি, ছোট শিশু কিংবা শারীরিকভাবে অসুস্থ কারও সঙ্গে গেলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। সঙ্গে পর্যাপ্ত পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখা ভালো।

খাগড়াছড়ির পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর বাইরে একটু ভিন্ন অভিজ্ঞতার জন্য দেবতা পুকুর দারুণ একটি স্থান। এই ভ্রমণ পাহাড়ি জনপদের একটি আলাদা গল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ারও সুযোগ তৈরি করে।