ইংল্যান্ডের ডরসেটের জুরাসিক উপকূল ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে বরাবরই আকর্ষণের। সমুদ্র, পাহাড়, জীবাশ্ম ও ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশাপাশি এই উপকূলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুই বিশ্বযুদ্ধের নানা স্মৃতিও। সম্প্রতি ওয়েস্ট বে থেকে লাইম রিজ হয়ে ফের ওয়েস্ট বে পর্যন্ত প্রায় ১০ মাইলের একটি হাঁটার পথ ভ্রমণকারীদের কাছে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।
এই ভ্রমণপথের শুরু ওয়েস্ট বে থেকে নৌযাত্রায়। দ্রুতগতির ছোট নৌযানে করে লাইম রিজে পৌঁছে সেখান থেকে হেঁটে ওয়েস্ট বেতে ফেরার পরিকল্পনা করা যায়। নৌপথে দেখা যায় চেশিল বিচ, পোর্টল্যান্ড ও লাইম উপসাগরের বিস্তীর্ণ দৃশ্য। সমুদ্রের নিচে থাকা একাধিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কেও জানা যায় এই পথে।
ডরসেট উপকূলের সামুদ্রিক ইতিহাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ১৯১৫ সালের এইচএমএস ফরমিডেবল দুর্ঘটনা। নতুন বছরের প্রথম দিনে জার্মান ডুবোজাহাজের টর্পেডোর আঘাতে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজটি ডুবে যায়। প্রায় ৭৫০ জনের মধ্যে ২০০ জনেরও কম সদস্য প্রাণে বেঁচেছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এই উপকূল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নরম্যান্ডি অভিযানের প্রস্তুতি হিসাবে এখানে মিত্রবাহিনীর বড় ধরনের সামরিক মহড়া হয়েছিল। ‘এক্সারসাইজ টাইগার’ চলাকালে জার্মান নৌযানের হামলায় শত শত মার্কিন সেনা নিহত হন। বর্তমানে ওই এলাকার কয়েকটি জাহাজডুবির স্থান যুদ্ধসমাধি হিসাবে সংরক্ষিত।
লাইম রিজে পৌঁছালে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ কবে। সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া এই বন্দরপ্রাচীর সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের কারণেও পরিচিত। জেন অস্টিনের ‘পারসুয়েশন’ উপন্যাসে এর উল্লেখ রয়েছে। জন ফাউলসের ‘দ্য ফ্রেঞ্চ লেফটেন্যান্টস উওম্যান’ অবলম্বনে তৈরি চলচ্চিত্রেও কবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।
লাইম রিজ থেকে ওয়েস্ট বে পর্যন্ত হাঁটার পথে রয়েছে একাধিক ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক আকর্ষণ। পুরনো ‘লং এন্ট্রি’ পথের স্মৃতিও এই অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ১৭২৫ সালে লেখক হেনরি ফিল্ডিং তাঁর আত্মীয়া সারাহকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
পথে মেরি অ্যানিংকে উৎসর্গ করা একটি ভাস্কর্যও রয়েছে। জীবাশ্ম অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই গবেষকের সঙ্গে লাইম রিজের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িত। তাঁর আবিষ্কারের স্মৃতিও ভাস্কর্যে তুলে ধরা হয়েছে।
এরপর পথ গিয়ে পৌঁছায় চারমাথে। অগভীর সমুদ্রের কারণে এলাকাটি সাঁতার ও জলক্রীড়ার জন্য জনপ্রিয়। চারমাথ থেকে ওয়েস্ট বে পর্যন্ত হাঁটার পথটি দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় পথের অংশ। একই পথে রয়েছে ‘মনার্কস ওয়ে’-এর একটি অংশ, যা রাজা দ্বিতীয় চার্লসের ইংল্যান্ড ছাড়ার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।
এই পথের আরও উল্লেখযোগ্য স্থান সেন্ট গ্যাব্রিয়েলের পুরনো গির্জার ধ্বংসাবশেষ। আঠারো শতকে গির্জাটি ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে চোরাকারবারিরা পরিত্যক্ত স্থাপনাটি পণ্য লুকানোর কাজে ব্যবহার করত বলে জানা যায়।
এরপর আসে গোল্ডেন ক্যাপ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৯১ মিটার উঁচু এই স্থানটি ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের সর্বোচ্চ বিন্দু। এখান থেকে লাইম উপসাগর ও আশপাশের উপকূলের বিস্তীর্ণ দৃশ্য দেখা যায়।
সিটাউন ও থর্নকম্ব বিকন পেরিয়ে পথ নেমে যায় আইপ মাউথের দিকে। এই এলাকার একটি গির্জায় সংগীতশিল্পী পিজে হার্ভের পুরস্কারজয়ী ‘লেট ইংল্যান্ড শেক’ অ্যালবামের কাজ হয়েছিল।
শেষ পর্যায়ে উপকূলের ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতিও চোখে পড়ে। পাহাড়ধসের কারণে কয়েকটি অংশে হাঁটার পথ পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০২০ সালের একটি পাহাড়ধসের স্মৃতিও পথে চিহ্নিত রয়েছে।
ওয়েস্ট বে একসময় ব্রিডপোর্টের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ছিল। তখন এর নাম ছিল ব্রিডপোর্ট হারবার। পরে পর্যটন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নাম পরিবর্তন করে ওয়েস্ট বে রাখা হয়। পুরনো রেলপথ এখন আর নেই, তবে সাবেক রেলস্টেশনটি বর্তমানে অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
লাইম রিজ থেকে ওয়েস্ট বে পর্যন্ত এই হাঁটার পথ তাই একসঙ্গে তুলে ধরে ডরসেটের ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য, জীবাশ্মের ইতিহাস, সাহিত্য, যুদ্ধের স্মৃতি এবং উপকূলীয় জনপদের পরিবর্তনের গল্প। গ্রীষ্মকালে লাইম উপসাগরে নৌযাত্রার সুযোগ থাকলেও ওয়েস্ট বে ও লাইম রিজের মধ্যে সারা বছর বাস পরিষেবাও চালু রয়েছে।