বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় ইতিহাসের এক প্রাচীন নিদর্শন কোতওয়ালী দরজা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ অঞ্চলে অবস্থিত প্রাচীন গৌড় নগরীর এই তোরণকে বলা হয় ‘গৌড়ের সিংহদ্বার’। একসময় গৌড়ের উপনগরী থেকে মূল রাজধানীতে প্রবেশের প্রধান পথ ছিল এটি। সীমান্তের জিরো লাইন থেকেও তোরণটি দেখা যায়, যা ইতিহাস ও ঐতিহ্যপ্রেমীদের কাছে জায়গাটিকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
‘কোতওয়াল’ শব্দটি এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। নগর পুলিশের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হতো। ধারণা করা হয়, গৌড় নগরীর দক্ষিণ দিকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল এই তোরণ। নগরী রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রহরীরা এখান থেকেই নিরাপত্তার কাজ করতেন।
একসময় কোতওয়ালী দরজার খিলানপথ ছিল প্রায় ৩০ ফুট উঁচু এবং ১৬ ফুট ৯ ইঞ্চি প্রশস্ত। তোরণের দুই পাশে শত্রুর ওপর কামানের গোলা ছোড়ার জন্য ছিদ্রও ছিল। সম্পূর্ণ গৌড়ীয় ইট দিয়ে তৈরি এই স্থাপনার ভেতরে ও বাইরে চারটি অর্ধবৃত্তাকার বুরুজ ছিল। প্রতিটি বুরুজের গায়ে অলংকৃত স্তম্ভ, সুচালো খিলান এবং নকশা করা কুলুঙ্গির নিদর্শন রয়েছে। তোরণের ভেতরে সশস্ত্র প্রহরীদের থাকার কক্ষগুলোতেও ছিল কারুকাজ ও পোড়ামাটির অলংকরণ। বর্তমানে এর মূল খিলান ভেঙে পড়েছে, তবু অবশিষ্ট স্থাপত্যে অতীতের নির্মাণশৈলীর পরিচয় মেলে।
কবে এবং কী উদ্দেশ্যে কোতওয়ালী দরজা নির্মিত হয়েছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। এখানে নির্মাণকাল-সংক্রান্ত কোনও শিলালিপি পাওয়া যায়নি। জেনারেল কানিংহামের মতে, দিল্লির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সময়, সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মৃত্যুর পর তোরণটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। সেই হিসাবে নির্মাণকাল ১২২৯ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি বা তার কিছু পরে বলে ধারণা করা হয়। ইতিহাসবিদ ড. দানির মতে, পান্ডুয়া থেকে গৌড়ে রাজধানী স্থানান্তরের পর নগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে এটি তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে এম আবিদ আলী খানের ধারণা, তোরণটি ১২৩৪ থেকে ১৩১৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী কোনও সময়ে নির্মিত হয়।
বর্তমানে কোতওয়ালী দরজা বাংলাদেশের সীমান্তের ওপারে ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থিত। তাই জায়গাটি ঘুরে দেখতে চাইলে সীমান্তের নিয়মকানুন ও নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা জরুরি। দূর থেকে দৃশ্যমান এই প্রাচীন তোরণ বাংলার মধ্যযুগীয় নগরসভ্যতা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।