আকাশ পরিষ্কার থাকলে বাংলাদেশের পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে দূরে দেখা যায় বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা। প্রায় ১২৪ কিলোমিটার দূরের এই পর্বতশৃঙ্গের দৃশ্য দেখতে শীতের মৌসুমে প্রকৃতিপ্রেমীদের আগ্রহের শেষ থাকে না। তবে কাঞ্চনজঙ্ঘা শুধু চোখজুড়ানো দৃশ্যের জন্যই বিখ্যাত নয়। এর নাম, উচ্চতা এবং স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস ঘিরেও রয়েছে নানা কাহিনি।
কাঞ্চনজঙ্ঘার নামের অর্থ নিয়েও রয়েছে বিশেষ ব্যাখ্যা। তিব্বতি ভাষার ‘কাং-চেন-দজো-ঙ্গা’ শব্দবন্ধের অর্থ বলা হয় ‘তুষারের পাঁচ ভান্ডার’। স্থানীয় লেপচা জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, এই পর্বতের পাঁচটি শৃঙ্গ পাঁচ ধরনের সম্পদের প্রতীক- সোনা, রুপা, রত্ন, শস্য এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। তাদের লোকবিশ্বাসে, এই পাঁচ ভান্ডারের সঙ্গে দেবতাদেরও সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতির বিশালতা আর লোককথার সংমিশ্রণ কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।
একসময় কাঞ্চনজঙ্ঘাকেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ বলে মনে করা হতো। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ জরিপকারীদের হিসাবেও এটি ছিল সর্বোচ্চ। পরে পরিমাপে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা বেশি বলে নির্ধারিত হলে সেই ধারণা বদলে যায়। বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,৫৮৬ মিটার উচ্চতার কাঞ্চনজঙ্ঘা পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। এর আগে রয়েছে এভারেস্ট ও কে-টু।
কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ঘিরে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর একটি হলো এর চূড়ায় পা না রাখার ঐতিহ্য। ১৯৫৫ সালে ব্রিটিশ পর্বতারোহী জো ব্রাউন ও জর্জ ব্যান্ড প্রথম সফলভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছান। সিকিমের মহারাজার অনুরোধ এবং স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা মূল চূড়ার কয়েক ফুট নিচেই থেমে যান। পরবর্তী অনেক অভিযাত্রীও এই রীতি মেনে চলেছেন। ফলে পর্বতারোহণের ইতিহাসে কাঞ্চনজঙ্ঘার এই ঐতিহ্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলার উত্তরাঞ্চলের সঙ্গেও এই পর্বতাঞ্চলের ঐতিহাসিক যোগাযোগের কথা আলোচনায় আসে। পঞ্চগড়ের ভিতরগড় প্রত্নস্থল প্রাচীন জনপদ ও বাণিজ্যপথের স্মৃতি বহন করে। হিমালয়সংলগ্ন অঞ্চলের সঙ্গে বাংলার মানুষের যোগাযোগের ইতিহাস বহু পুরোনো। ১৫০০ বছর ধরে তিব্বত-নেপাল-ভুটান বাণিজ্য পথের কেন্দ্র ছিল এটি। ভিতরগড়ের বাণিজ্যপথ দিয়েই কাঞ্চনজঙ্ঘার কাহিনি বাংলায় ছড়িয়েছিল বলে মনে করা হয়। তবে এমন দাবির পক্ষে আরও ঐতিহাসিক প্রমাণ প্রয়োজন।
তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা তাই শুধু পাহাড় দর্শন নয়, বরং প্রকৃতি, ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ভোরের আলোয় কিংবা কুয়াশামুক্ত শীতের সকালে দূরের তুষারশৃঙ্গ যখন আকাশের গায়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন বাংলাদেশের সমতলভূমি থেকেও হিমালয়ের বিশালতা অনুভব করা যায়। সেই দৃশ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে করে তুলেছে এক স্মরণীয় আকর্ষণ।