শুধু বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের জন্যই নয়, গড় উচ্চতার নিরিখেও পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতমালা হিমালয়। এর তিনটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গের গড় উচ্চতা ৮,৬৫০ মিটার। সম্প্রতি ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট প্রকাশিত এক তালিকায় বিশ্বের উচ্চতম পর্বতমালার মধ্যে প্রথম স্থান পেয়েছে হিমালয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে কারাকোরাম ও পামির পর্বতমালা। তালিকার প্রথম দশটি পর্বতমালার মধ্যে আটটিই এশিয়ায় অবস্থিত। কোনও পর্বতমালার একটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গের উচ্চতা নয়, বরং তার তিনটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গের গড় উচ্চতার ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
হিমালয়ের তিন উচ্চতম শৃঙ্গ
হিমালয়ের তিনটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হল মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৯ মিটার), কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮,৫৮৬ মিটার) এবং লোৎসে (৮,৫১৬ মিটার)। বিশ্বের চারটি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের মধ্যে এই তিনটিরই অবস্থান রয়েছে। এভারেস্ট বিশ্বের সর্বোচ্চ, কাঞ্চনজঙ্ঘা তৃতীয় এবং লোৎসে চতুর্থ স্থানে। ভারতের কাছে কাঞ্চনজঙ্ঘার গুরুত্ব বিশেষ। সিকিমে ভারত-নেপাল সীমান্তে অবস্থিত এই শৃঙ্গ।
তবে এভারেস্টের জনপ্রিয়তা পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে নতুন সমস্যাও তৈরি করেছে। বিশেষ করে মূল অভিযানের মৌসুমে চড়াইয়ের পথে পর্বতারোহীদের ভিড় বাড়ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত ভিড়ের সমস্যা।
বিশ্বের উচ্চতম পর্বতমালার তালিকা
তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কারাকোরাম। এই পর্বতমালার তিনটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গের গড় উচ্চতা ৮,২৪৭ মিটার। শৃঙ্গগুলি হল কে-টু (৮,৬১১ মিটার), গাশেরব্রুম-১ (৮,০৮০ মিটার) এবং ব্রড পিক (৮,০৫১ মিটার)। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কে-টু। খাড়া ঢাল, পাথর ধস, তুষারধসের আশঙ্কা এবং অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে অনেকেই মনে করেন, এভারেস্টের তুলনায় কে-টু জয় করা বেশি কঠিন।
তৃতীয় স্থানে রয়েছে পামির পর্বতমালা। এর তিনটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গের গড় উচ্চতা ৭,৫৭৫ মিটার। সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কংগুর তাগ (৭,৬৪৯ মিটার)। এর পর রয়েছে মুজতাগ আতা (৭,৫৪৬ মিটার) এবং কংগুর জিউবি (৭,৫৩০ মিটার)। চতুর্থ স্থানে হিন্দুকুশ পর্বতমালা। এর তিনটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গের গড় উচ্চতা ৭,৫৩৪ মিটার। সর্বোচ্চ শৃঙ্গ তিরিচ মিরের উচ্চতা ৭,৭০৮ মিটার। তালিকায় এর পর রয়েছে নোশাক (৭,৪৯২ মিটার) এবং ইস্তোর-ও-নাল (৭,৪০৩ মিটার)।
পঞ্চম থেকে অষ্টম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে তিয়ান শান, নিয়েনচেন তাংলা, হেংদুয়ান এবং কুনলুন পর্বতমালা। এই চারটি পর্বতমালারই তিনটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গের গড় উচ্চতা ৭,০০০ মিটারের বেশি। এশিয়ার বাইরে সবচেয়ে উঁচু পর্বতমালা হিসেবে নবম স্থানে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ। দশম স্থানে রয়েছে আলাস্কা ও কানাডার উত্তর-পশ্চিম অংশ জুড়ে বিস্তৃত সেন্ট এলিয়াস পর্বতমালা।
ভারতের উচ্চতম পর্বতমালা ও শৃঙ্গ
তালিকার আটটি এশীয় পর্বতমালার মধ্যে দুটি ভারতের ভূখণ্ডেও বিস্তৃত—হিমালয় ও কারাকোরাম। ভারতের হিমালয় অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশ জুড়ে বিস্তৃত।
ভারত-নেপাল সীমান্তে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার উচ্চতা ৮,৫৮৬ মিটার। ভারতের আর একটি উল্লেখযোগ্য শৃঙ্গ নন্দাদেবী, যার উচ্চতা ৭,৮১৬ মিটার। উত্তরাখণ্ডে অবস্থিত এই পর্বতশৃঙ্গটি সম্পূর্ণ ভারতের ভূখণ্ডের মধ্যে থাকা সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।
অন্য দিকে, কারাকোরাম পর্বতমালার অংশ কে-টু-র উচ্চতা ৮,৬১১ মিটার। এটি পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে অবস্থিত, যে অঞ্চলকে ভারত নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে।
এই পর্বতশৃঙ্গগুলির সৌন্দর্য দেখতে অবশ্য পর্বতারোহণের অভিযানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ভারতের বেশ কয়েকটি পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র থেকে হিমালয়ের অপরূপ দৃশ্য দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিংয়ের টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয়ের সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে এভারেস্টও দেখা যেতে পারে। উত্তরাখণ্ডের মুনসিয়ারি থেকে দেখা যায় পঞ্চচুল্লি পর্বতশৃঙ্গ। মিলাম ও রালাম হিমবাহের দিকে ট্রেকিংয়েরও অন্যতম সূচনাস্থল এই পাহাড়ি জনপদ।
উত্তরাখণ্ডের কৌসানি থেকে নন্দাদেবী, ত্রিশূল-সহ হিমালয়ের একাধিক শৃঙ্গের দৃশ্য উপভোগ করতে ভিড় করেন পর্যটকেরা। অন্য দিকে, নৈনিতালের স্নো ভিউ পয়েন্ট থেকে দেখা যায় নন্দাদেবী, নন্দাকোট এবং ত্রিশূল শৃঙ্গ।
কেন এত উঁচু হিমালয়?
কোটি কোটি বছর আগে ভারতীয় টেকটোনিক পাতের সঙ্গে ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষের ফলে হিমালয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। এই সংঘর্ষে পৃথিবীর ভূত্বক উপরের দিকে উঠে গিয়ে তৈরি হয় বিশাল এই পর্বতমালা। ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের তথ্য অনুযায়ী, দুটি পাতের মধ্যে এখনও সংঘর্ষ ও গতিশীলতা অব্যাহত রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে হিমালয় অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক কর্মকাণ্ডে এবং পর্বতমালার কিছু অংশের উচ্চতা বৃদ্ধিতেও।