মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে একটি বাড়ির চারটি ঘরে সাজানো রয়েছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০০ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন। ২০০ বছরের পুরনো মুদ্রা, যুদ্ধের সরঞ্জাম, প্রাচীন গয়না থেকে শুরু করে তাঁত ও কৃষিকাজের উপকরণ নিয়ে এক ব্যক্তির উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এই সংগ্রহশালা। ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরি ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’ নামের এই জাদুঘরে গেলে পরিচয় মিলবে মণিপুরিদের হারিয়ে যেতে বসা জীবনযাপন, শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ঘুরতে গেলে দেখে আসতে পারেন মণিপুরি সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালা। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই সংগ্রহশালায় রয়েছে ২৭০ ধরনের তিন শতাধিক ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী।
২০০৬ সালে নিজের বাড়িতেই জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করেন মণিপুরি লেখক ও গবেষক হামোম তনু বাবু। প্রথমে একটি ঘরে অল্প কিছু সামগ্রী নিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে তাঁর বাড়ির চারটি কক্ষে সাজানো রয়েছে সংগ্রহের নানা নিদর্শন। বাবার স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরের উদ্দেশ্য মণিপুরি সম্প্রদায়ের হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের ইতিহাস তুলে ধরা।
জাদুঘরে রয়েছে প্রায় ২০০ বছর আগের মুদ্রা, মণিপুরি মহাকাব্যের নায়ক-নায়িকার ছবি এবং যুদ্ধবিগ্রহে ব্যবহৃত নানা উপকরণ। পাশাপাশি দেখা মিলবে প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেবদেবীর পরিচিতি, মণিপুরি নারীদের ব্যবহৃত গয়না ও সাজসজ্জার সামগ্রী, কাঁসা-পিতলের কলস, জগ ও মগের। বাঁশ-বেতের তৈরি নিত্যব্যবহার্য জিনিস, কাপড় বোনার পুরনো সরঞ্জাম, কৃষিকাজের উপকরণ এবং প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রও রয়েছে সংগ্রহে।
কমলগঞ্জের আদমপুর ইউনিয়নের ছনগাঁও গ্রামে অবস্থিত এই জাদুঘর শুধু পর্যটকদের কাছেই নয়, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গবেষক ও পর্যটকেরা এখানে আসেন মণিপুরি সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে। স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মতে, এই সংগ্রহশালার মাধ্যমে নিজেদের পূর্বপুরুষদের জীবন, সংস্কৃতি ও বীরত্বের ইতিহাস জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মণিপুরি কবি সনাতন হামোমের মতে, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থায়নে গড়ে ওঠা এই সংগ্রহশালা একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক উপাদান সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাঁর মতে, জাদুঘরটিকে আরও সমৃদ্ধ ও আধুনিক করা প্রয়োজন।
জাদুঘরটি পরিদর্শন করে সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন তৎকালীন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান। জাদুঘরের জন্য স্থায়ী ভবন নির্মাণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবিও উঠেছে।
কমলগঞ্জের প্রাকৃতিক পরিবেশ, চা-বাগান ও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি দেখতে যারা যান, তাদের ভ্রমণতালিকায় এই জাদুঘর নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এখানে গেলে শুধু কিছু পুরনো জিনিস দেখা নয়, মণিপুরি সম্প্রদায়ের অতীত, জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ মিলবে।