থাইল্যান্ডের এই শহরে গেলে ভুলবেন ইউরোপের কথা

ইউরোপ ভ্রমণের ইচ্ছা থাকলেও খরচের কথা ভেবে অনেকেই পিছিয়ে যান। তবে এশিয়ার বুকেই রয়েছে এমন কিছু জায়গা, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য, পুরনো স্থাপত্য আর শান্ত পরিবেশ মিলিয়ে পাওয়া যায় ইউরোপের মতোই মনোরম আবহ। তেমনই এক গন্তব্য থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই। ব্যাংককের কোলাহল থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ে ঘেরা এই শহর প্রকৃতিপ্রেমী ও সংস্কৃতির খোঁজে ঘুরতে ভালোবাসেন, এমন পর্যটকদের জন্য আদর্শ।

এখানকার পুরনো শহরে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য বৌদ্ধমন্দির (ছবি: সংগৃহীত)

১২৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চিয়াং মাই একসময় লান না রাজ্যের রাজধানী ছিল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত শহরটি পাহাড়, বনভূমি, জলপ্রপাত, গুহা ও উপত্যকায় ঘেরা। এখানকার পুরনো শহরে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য বৌদ্ধমন্দির। মন্দিরের স্থাপত্য, কমলা পোশাকের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপস্থিতি আর শান্ত পরিবেশ শহরটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। থাই, বার্মিজ, শ্রীলঙ্কান ও লান না স্থাপত্যরীতির মিশেলও চোখে পড়বে নানা স্থাপনায়।

চিয়াং মাই ঘুরতে গেলে প্রথমেই রাখা যেতে পারে শহরের প্রাচীন মন্দিরগুলো। ওয়াত চিয়াং মান শহরের সবচেয়ে পুরনো মন্দিরগুলোর একটি। ওয়াত চেদি লুয়াংয়ের বিশাল স্তূপ ১৫৪৫ সালের ভূমিকম্পে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ১৩৪৫ সালে নির্মিত ওয়াত ফ্রা সিং মন্দিরেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য বুদ্ধমূর্তি। তবে শহরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি ওয়াত ফ্রা থাত দই সুদেপ। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই মন্দিরে পৌঁছতে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরোতে হয়। সেখান থেকে চিয়াং মাই শহরের বিস্তৃত দৃশ্যও দেখা যায়।

শহরটি পাহাড়, বনভূমি, জলপ্রপাত, গুহা ও উপত্যকায় ঘেরা (ছবি: সংগৃহীত)

শহরের বাইরে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন জলপ্রপাত, গুহা ও উপত্যকাগুলোতে। চিয়াং মাই থেকে প্রায় চার ঘণ্টার পথ পেরিয়ে পৌঁছনো যায় পাই নামের নদীপাড়ের গ্রামে। পাহাড়ি পরিবেশ, নদী আর নিরিবিলি আবহের জন্য জায়গাটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া শহর থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দূরে সান কামফাংয়ের উষ্ণ প্রস্রবনও ঘুরে দেখতে পারেন।

শহরের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ভালো সুযোগ মেলে বিভিন্ন উৎসবে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয় ফুল উৎসব। এ সময় নানা ফুলের প্রদর্শনীর পাশাপাশি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও প্যারেডের আয়োজন থাকে। এপ্রিলের ১৩ থেকে ১৫ তারিখ পালিত হয় থাই নববর্ষের উৎসব সংক্রান। জল ছোড়াছুড়ি, নাচ, শোভাযাত্রা ও ধর্মীয় আয়োজন উৎসবটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। আর নভেম্বরের মাঝামাঝি লয় ক্রাথং উৎসবে পূর্ণিমার রাতে কলাগাছের ভেলায় মোমবাতি, ফুল ও ধূপ সাজিয়ে পানিতে ভাসান স্থানীয়রা। রাতের আকাশ ও জলজুড়ে তৈরি হয় অপূর্ব দৃশ্য।

জায়গাটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় (ছবি: সংগৃহীত)

চিয়াং মাইয়ের রাতের বাজারও পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। সেখানে সিল্ক, সুতি কাপড়, রুপার গয়না, কাঠের খোদাই করা সামগ্রী, হস্তশিল্প ও নানা স্মারক পাওয়া যায়। শহরের কাছে বো সাং গ্রাম বিশেষভাবে পরিচিত হস্তশিল্প ও ছাতা তৈরির কাজের জন্য। কেনাকাটার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কারুশিল্প কাছ থেকে দেখার সুযোগও মেলে।

খাবারের ক্ষেত্রেও চিয়াং মাইয়ের নিজস্ব পরিচিতি রয়েছে। এখানকার জনপ্রিয় পদ নায়েম সসেজ এবং খাও সোই—নারকেলের দুধ ও মশলায় তৈরি এক ধরনের নুডলস। স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি চীনা, ইতালীয়, ফরাসি, জার্মান ও মুসলিম রীতির খাবারও পাওয়া যায়। চাইলে খানটক ডিনারের আয়োজনেও অংশ নিতে পারেন, যেখানে উত্তরের ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে পরিবেশিত হয় স্থানীয় নৃত্য।

থাকার জন্য শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল ও সাশ্রয়ী অতিথিনিবাস রয়েছে। শহরের বাইরে নিরিবিলি পরিবেশে থাকতে চাইলে মা সা উপত্যকায় বেছে নিতে পারেন বাংলো বা কেবিন। শহরের ভেতরে পায়ে হেঁটে ঘোরা যায়। প্রয়োজনে বাস, মিনিবাস বা তিন চাকার স্থানীয় যান ব্যবহার করতে পারেন।

কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে বিমানে প্রথমে ব্যাংকক যেতে হবে। সেখান থেকে থাই এয়ারওয়েজসহ বিভিন্ন সংস্থার বিমানে প্রায় এক ঘণ্টায় চিয়াং মাই পৌঁছনো যায়। চাইলে ব্যাংকক থেকে বাস বা ট্রেনেও যাওয়া সম্ভব। বাসে সময় লাগে প্রায় ১২ ঘণ্টা, আর ট্রেনে প্রায় ১৪ ঘণ্টা। ভ্রমণের আগে বিমান, থাকা ও যাতায়াতের খরচ এবং ভিসার নিয়ম জেনে পরিকল্পনা করে নেওয়া ভালো।