এক দেশ থেকে আরেক দেশ, কখনও ঘন জঙ্গল, কখনও মরুভূমি, আবার কখনও বরফে ঢাকা দুর্গম পথ। এভাবেই টানা ২৮ বছর ধরে পায়ে হেঁটে পৃথিবী ঘুরেছেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী কার্ল বুশবি। অবশেষে তাঁর দীর্ঘ অভিযানের ইতি ঘটেছে। গত ২ নভেম্বর ইংল্যান্ডের হাল শহরে মায়ের বাড়িতে পৌঁছান ৫৭ বছর বয়সী এই অভিযাত্রী। সব মিলিয়ে তাঁর পাড়ি দেওয়া পথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ হাজার কিলোমিটার।
১৯৯৮ সালের ১ নভেম্বর দক্ষিণ চিলির পুন্তা আরেনাস থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন কার্ল। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৯ বছর। লক্ষ্য ছিল, কোনও যানবাহনে না চেপে হেঁটেই পৃথিবী ঘুরে নিজের বাড়িতে ফেরা। ‘গোলিয়াথ এক্সপেডিশন’ নামের এই অভিযানে তাঁকে পেরোতে হয়েছে চারটি মহাদেশ ও ৩০টি দেশ। শর্ত ছিল, যাত্রাপথে কোনও যানবাহন ব্যবহার করা যাবে না এবং বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত অভিযান শেষ করা যাবে না।
এই পথে কখনও মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দুর্গম জঙ্গল, কখনও বিস্তীর্ণ মরুভূমি, আবার কখনও বরফে ঢাকা প্রান্তর পেরিয়েছেন তিনি। আলাস্কা থেকে রাশিয়ার মধ্যবর্তী বেরিং প্রণালির বরফাচ্ছন্ন পথ অতিক্রম করেছেন। সাঁতরে পাড়ি দিয়েছেন কাস্পিয়ান সাগর ও ইংলিশ চ্যানেলও। গত অক্টোবরেই ফ্রান্স থেকে সাঁতরে ইংল্যান্ডে পৌঁছান কার্ল।
তবে এই অভিযান ছিল নানা বাধায় ভরা। পানামায় গ্রেপ্তার হয়ে ১৮ দিন কারাগারে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। মেক্সিকোতে মুখোমুখি হয়েছেন সশস্ত্র ব্যক্তিদের। রাশিয়ায় প্রবেশের ভিসা ও সীমান্তসংক্রান্ত জটিলতায়ও দীর্ঘদিন আটকে ছিল যাত্রা। ২০১২ সালে ভিসা না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ওয়াশিংটন ডিসিতে রুশ দূতাবাস পর্যন্ত হেঁটে প্রতিবাদ জানান তিনি। পরে প্রয়োজনীয় অনুমতি পেয়ে ফের যাত্রা শুরু করেন।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, করোনাভাইরাস মহামারি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণেও বারবার থমকে গেছে তাঁর পথচলা। প্রথমে ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে অভিযান শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সময় লেগেছে ২৮ বছর।
অবশেষে ২ নভেম্বর নিজের শহর হালে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানাতে জড়ো হন শত শত মানুষ। শহরের কেন্দ্র থেকে মায়ের বাড়ি পর্যন্ত শেষ কয়েক মাইলও হেঁটেই যান কার্ল। বাড়ির সামনে অপেক্ষায় ছিলেন মা অ্যাঞ্জেলা, ছেলে ও ১২ বছর বয়সী নাতনি। দীর্ঘ ২৮ বছর পর মাকে জড়িয়ে ধরার মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন।
কার্ল জানিয়েছেন, এই দীর্ঘ পথ একা পাড়ি দেওয়া সম্ভব হতো না। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের সহযোগিতা ও আন্তরিকতাই তাঁকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। তাঁর এই অভিযানের অনুপ্রেরণা অবশ্য এসেছিল বাবার পাঠানো একটি জন্মদিনের কার্ড থেকে। নব্বইয়ের দশকে সেই কার্ডে লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে একটি আলোচনার উল্লেখ ছিল। সেই ভাবনা থেকেই পৃথিবী ঘুরে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি।
২৮ বছর পর ঘরে ফিরলেও দীর্ঘদিনের অভ্যাস ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কেমন হবে, তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চিত কার্ল। তবে তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া বার্তা স্পষ্ট, নিজের সামর্থ্যকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। বড় স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি তা পূরণের সাহসও রাখতে হয়।