দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সময় যেন এখানে থমকে আছে। পুরনো দালানের গায়ে শ্যাওলার আস্তরণ, কোথাও খসে পড়েছে ইট, কোথাও আবার ভাঙা দরজা-জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়েছে আগাছা। চারপাশে নীরবতা। অথচ এক সময় এই চত্বরেই ছিল জমিদারির জাঁকজমক, আনাগোনা ছিল প্রজাদের, বসতো নানা আয়োজন।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার বাইশরশি গ্রামের এই জমিদারবাড়ি আজও সেই অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। স্থানীয় ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদ এক সময় ২২টি পরগনার জমিদারদের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে বহু বছর আগে, বদলে গিয়েছে সময়ও। কিন্তু বাড়িটির দেয়াল যেন এখনও বলে যায় হারিয়ে যাওয়া সেই দিনের গল্প।
তবে ইতিহাসের সাক্ষী এই স্থাপনাটির বর্তমান অবস্থা সুখকর নয়। অযত্ন, অবক্ষয় এবং বিভিন্ন সময়ে মূল্যবান স্থাপত্য উপকরণ চুরির অভিযোগে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে জমিদারবাড়ির পুরনো চেহারা।
যে বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে ২২ পরগনার ইতিহাস
বাইশরশি জমিদারদের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী ধরে স্থানীয় জনজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সাহা পরিবারের হাত ধরে এই জমিদারির উত্থানের কথা জানা যায়। পরবর্তী সময়ে তাদের জমিদারি ফরিদপুর, বরিশাল-সহ ২২টি পরগনা বা জোত মহল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই জমিদারির স্মৃতি বহন করছে বাইশরশির প্রাসাদটি। বাড়িটির নির্মাণকাল নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। কোথাও প্রায় দেড় শতাব্দী, কোথাও আবার প্রায় ২০০ বছরের পুরনো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সাল নিয়ে মতভেদ থাকলেও স্থাপনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহ নেই।
এক সময় এই বাড়ি ছিল বিশাল এক জমিদারি কমপ্লেক্স। ছোট-বড় মিলিয়ে ১৪টি দালান, পাঁচটি শানবাঁধানো পুকুর, বাগানবাড়ি—সব মিলিয়ে ছিল জমিদারির আভিজাত্যের ছাপ। পূজামণ্ডপ, নাচঘর-সহ নানা স্থাপনার কথাও পুরনো বিবরণে পাওয়া যায়।
এখন সেই জৌলুস কোথায়
জমিদারি প্রথা উঠে যাওয়ার পর বদলে যায় বাইশরশির ছবিটা। জমিদার পরিবারের অনেকেই কলকাতায় চলে যান। পরিত্যক্ত হতে থাকে বিশাল বাড়ির একাধিক অংশ। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে স্থাপত্য।
দালানের দেওয়ালে ফাটল, খসে পড়া ইট-সুরকি আর গজিয়ে ওঠা গাছপালা এখন সেই সময়ের সাক্ষী। যে দরজা-জানালা এক সময় বাড়িটির সৌন্দর্য বাড়াত, তার অনেকগুলিই আর নেই। বিভিন্ন প্রতিবেদনে মূল্যবান দরজা-জানালা এবং লোহার কারুকাজ চুরির অভিযোগও উঠে এসেছে।
শুধু স্থাপত্যের ক্ষয় নয়, জমিদারবাড়ির জমি নিয়েও দখলের অভিযোগ রয়েছে। ফলে যে বিশাল পরিসর এক সময় জমিদারির অংশ ছিল, তার অনেকটাই আজ আর আগের অবস্থায় নেই।
‘গুপ্তধনের’ খোঁজে বউঘাটে খোঁড়াখুঁড়ি
জমিদারবাড়ির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয় ২০২৬ সালের একটি ঘটনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, গুপ্তধনের আশায় জমিদারবাড়ির একটি পুকুরের ঐতিহ্যবাহী ‘বউঘাট’ খুঁড়ে ফেলা হয়। পরে খনন করা জায়গায় পুরনো পাথরের সামগ্রী ও ভাঙা তৈজসপত্র পড়ে থাকার কথা উঠে আসে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। তাদের আশঙ্কা, এ ভাবে খোঁড়াখুঁড়ি চলতে থাকলে জমিদার আমলের আরও বহু নিদর্শন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের দাবিও ফের সামনে আসে।
পর্যটকের চোখে কেন আলাদা
বাইশরশি জমিদারবাড়ি এমন কোনও সাজানো পর্যটনকেন্দ্র নয়, যেখানে ঢুকলেই তৈরি পরিকাঠামো, রেস্তোরাঁ বা বিনোদনের ব্যবস্থা মিলবে। এর আকর্ষণ অন্য জায়গায়।
পুরনো স্থাপত্য, জমিদারি আমলের ইতিহাস, পুকুরের ঘাট এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা দালান সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন একটি জীবন্ত ইতিহাসের পাতা। যারা পুরনো স্থাপত্য, জমিদারবাড়ি কিংবা বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের খোঁজ করতে ভালবাসেন, তাদের কাছে বাইশরশি আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।
কী ভাবে যাবেন
ফরিদপুর শহর থেকে বাইশরশি জমিদারবাড়ির দূরত্ব প্রায় ৩৪-৩৫ কিলোমিটার। সদরপুর উপজেলার বাইশরশি গ্রামে, আটরশি-পুকুরিয়া সড়কের পাশে এই জমিদারবাড়ির অবস্থান।
ফরিদপুর শহর থেকে সড়কপথে সদরপুরের দিকে গিয়ে আটরশি-পুকুরিয়া সড়ক ধরে বাইশরশি এলাকায় পৌঁছানো যায়। স্থানীয়দের কাছে জমিদারবাড়ির কথা বললে পথনির্দেশ পাওয়া সহজ।
ইতিহাস শুধু দেখার নয়, বাঁচিয়ে রাখারও
বাইশরশি জমিদারবাড়ির গল্প শুধু একটি পুরনো প্রাসাদের গল্প নয়। এটি বাংলার জমিদারি ব্যবস্থা, সামাজিক ইতিহাস এবং স্থাপত্য ঐতিহ্যেরও একটি অংশ। সময়ের সঙ্গে জমিদারি নেই, নেই সেই আড়ম্বরও। কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে যে স্থাপনাটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে, সেটি হারিয়ে গেলে হারাবে অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিও।