শতবর্ষ পেরিয়েও জমজমাট সরকার বাজার, হাটের দিনে বদলে যায় পুরো চিত্র

ফিচার ডেস্ক
১১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩০ আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫১

মৌলভীবাজার শহর থেকে সিলেটের পথে এগোতে থাকলে চারপাশের দৃশ্য ধীরে ধীরে বদলে যায়। শহুরে ব্যস্ততা পেরিয়ে চোখে পড়ে সবুজের বিস্তার, গ্রামীণ জনপদ আর রাস্তার দুই পাশে ছোট-বড় বাজার। এরই মধ্যে একটি জায়গা আলাদা করে নজর কাড়ে ‘সরকার বাজার’।

মৌলভীবাজার সদর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে মৌলভীবাজার-সিলেট সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা এই বাজারের বয়স শতাধিক বছর। সময়ের সঙ্গে বদলেছে বাজারের অবকাঠামো, বেড়েছে দোকানপাট ও মানুষের চলাচল। কিন্তু পুরোনো হাটের প্রাণচাঞ্চল্য এখনো টিকে আছে।

শতবর্ষের পথচলা: সরকার বাজারের ইতিহাস স্থানীয় মানুষের স্মৃতি ও এলাকার বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। একসময় আশপাশের গ্রামের মানুষের কেনাকাটা ও পণ্য বিক্রির অন্যতম প্রধান জায়গা ছিল এই হাট।

বর্তমানে স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি হাটের দিন এখানে বসে অস্থায়ী দোকান ও পণ্যের পসরা। ফলে সাধারণ দিনের বাজার আর হাটবারের বাজারের মধ্যে তৈরি হয় স্পষ্ট পার্থক্য।

স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় এই হাট ছিল আশপাশের এলাকার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। শত বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এখনো দেখা যায়।

হাটবারে যেন অন্য রূপ: সরকার বাজারের আসল ব্যস্ততা দেখা যায় হাটের দিনে। সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে বলে স্থানীয়দের মধ্যে এই দিনগুলোকে ঘিরে থাকে আলাদা প্রস্তুতি। সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসতে শুরু করেন।

কেউ আসেন গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে, কেউ কৃষিপণ্য বিক্রি করতে। আবার কেউ শুধু হাটের পরিচিত পরিবেশে দেখা-সাক্ষাৎ ও প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সারতে আসেন।

হাটে বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। স্থানীয় কৃষিপণ্য, মাছ, শাকসবজি, ফলমূল, গৃহস্থালির সামগ্রীসহ নানা পণ্যের পসরা বসে। মানুষের ভিড় আর বিক্রেতাদের হাঁকডাকে ব্যস্ত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

গরুর হাটেও পরিচিত: সরকার বাজারের আরেকটি পরিচিতি হলো গরুর হাট। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বৃহস্পতিবার এখানে গরুর হাট বসে এবং দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা।

হাটের এই অংশটি দেখতে চাইলে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর যাওয়ার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। তবে পশুর হাটে ভিড় বেশি থাকায় দর্শনার্থীদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্থানীয় নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।

বাজারের ভেতরেই গ্রামীণ জীবনের ছবি: সরকার বাজারে ঘুরতে গেলে শুধু দোকান আর পণ্যের সারি চোখে পড়ে না; বরং দেখা যায় একটি গ্রামীণ জনপদের দৈনন্দিন জীবন।

কোনও দোকানের সামনে কয়েকজন বসে চা খাচ্ছেন, কোথাও চলছে দরদাম, আবার কোনও জায়গায় কৃষক নিজের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করছেন। দূরবর্তী গ্রাম থেকে আসা মানুষদের পোশাক, কথাবার্তা ও পণ্য কেনাবেচার ধরনেও পাওয়া যায় স্থানীয় সংস্কৃতির ছাপ।

একজন ভ্রমণকারীর জন্য এই সাধারণ দৃশ্যগুলোই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা।

স্থানীয় খাবারের স্বাদ: পুরোনো হাটের সঙ্গে স্থানীয় খাবারের সম্পর্কও বেশ গভীর। বাজারে ঘুরতে গেলে স্থানীয় চায়ের দোকান, নাশতার দোকান কিংবা ছোট খাবারের দোকানে বসে এলাকার মানুষের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো যায়।

ভ্রমণের সময় স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি খাবারের পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও খেয়াল রাখা উচিত।

কীভাবে যাবেন: সরকার বাজার মৌলভীবাজার-সিলেট সড়কের পাশে অবস্থিত। মৌলভীবাজার সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৯ কিলোমিটার।

মৌলভীবাজার শহর থেকে সড়কপথে স্থানীয় যানবাহন বা ব্যক্তিগত পরিবহনে বাজারে যাওয়া যায়। হাটের প্রাণচাঞ্চল্য দেখতে চাইলে হাটবারে যাওয়াই ভালো। বিশেষ করে গরুর হাট দেখতে চাইলে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

তবে ভ্রমণের আগে স্থানীয়ভাবে হাট বসার দিন ও সময় নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো, কারণ বাজারের কার্যক্রম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।

আশপাশে যা দেখবেন: মৌলভীবাজার এমন একটি জেলা, যেখানে বাজারভ্রমণের সঙ্গে প্রকৃতিভ্রমণও সহজে মিলিয়ে নেওয়া যায়। সরকার বাজার ঘুরে এরপর জেলার বিভিন্ন চা-বাগান, সবুজ গ্রামাঞ্চল কিংবা অন্যান্য দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

বিশেষ করে যারা প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে গিয়ে স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন দেখতে চান, তাদের জন্য এমন একটি পুরোনো হাট আলাদা অভিজ্ঞতা দিতে পারে।

শুধু বাজার নয়, একটি জীবন্ত ঐতিহ্য: শত বছর আগে যে বাজার স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন মেটাতে গড়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে তার পরিসর বদলেছে। কিন্তু বাজারের মূল উদ্দেশ্য মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ এবং পণ্য বিনিময়, যা এখনও একই আছে।

আজকের সরকার বাজারে হয়তো আগের মতো কাঁচা রাস্তা বা পুরোনো দোকানের সারি নেই। এসেছে আধুনিক দোকান, যানবাহন ও নতুন ব্যবসা। তবু হাটবারে মানুষের ভিড়, কৃষকের পণ্য নিয়ে আসা, বিক্রেতার হাঁক আর ক্রেতার দরদাম সবকিছু মিলিয়ে শতবর্ষের সেই বাজারি সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা এখনও স্পষ্ট।

মৌলভীবাজারের সরকার বাজার তাই শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়। এটি একটি জনপদের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক স্মৃতি, মানুষের জীবনযাত্রা এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির জীবন্ত ছবি। শত বছর পেরিয়েও যে হাট তার কোলাহল ধরে রেখেছে, সেই কারণেই ভ্রমণপিপাসুদের কাছে সরকার বাজার হতে পারে একটু ভিন্ন ধরনের গন্তব্য।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
লালমনিরহাটে ১৪০০ বছর আগের সাহাবি যুগের ‘হারানো মসজিদ’
পর্যটন শুধু বিনোদন নয়, অর্থনীতি ও জীবিকারও শক্তি
নিমতলী দেউড়ি, যার এক ফটকেই লুকিয়ে নবাবি আমলের গল্প
সর্বশেষ খবর
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
পূজামণ্ডপে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ রোধ, আনসার সদস্যদের হাতে আটক ৭
পূজামণ্ডপে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ রোধ, আনসার সদস্যদের হাতে আটক ৭
মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার দুই প্রতিপক্ষের নাম ঘোষণা
মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার দুই প্রতিপক্ষের নাম ঘোষণা
‘মব’ তকমায় আড়াল হচ্ছে পরিকল্পিত অপরাধ?
৯ মাসে ১৭১ মৃত্যু ‘মব’ তকমায় আড়াল হচ্ছে পরিকল্পিত অপরাধ?
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সচিবালয়ে রাতে থাকছেন আমিনুল হক
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সচিবালয়ে রাতে থাকছেন আমিনুল হক
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক 
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক