রূপকথার গ্রাম আলবেরোবেল্লো, যেখানে পাথরের ঘরেই লেখা ইতিহাস

দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কোনও রূপকথার বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে একটি গ্রাম। সাদা দেয়াল, শঙ্কু আকৃতির পাথরের ছাদ, সরু গলি আর সারি সারি ছোট ঘর। ইতালির আলবেরোবেল্লো যেন বাস্তবের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক কল্পনার জগৎ।

দক্ষিণ ইতালির পুগলিয়া অঞ্চলের ইত্রিয়া উপত্যকায় অবস্থিত এই ছোট শহরটি বিশেষভাবে পরিচিত ‘ত্রুল্লি’ নামের ঐতিহ্যবাহী পাথরের ঘরের জন্য। ১৯৯৬ সালে আলবেরোবেল্লোর ত্রুল্লি স্থাপত্যকে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ইতালির সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, আলবেরোবেল্লোতে রয়েছে ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি ত্রুল্লি। তবে এই ধরনের স্থাপনা ইত্রিয়া উপত্যকার আরও কয়েকটি এলাকায় দেখা গেলেও সবচেয়ে বেশি এবং ভালোভাবে সংরক্ষিত ত্রুল্লিগুলো রয়েছে আলবেরোবেল্লোতেই।

ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে আলবেরোবেল্লোর ত্রুল্লি স্থাপত্য (ছবি: সংগৃহীত)

পাথরের ছাদে আলাদা এক পৃথিবী

আলবেরোবেল্লোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর ত্রুল্লি ঘর। চুনাপাথরের তৈরি এসব ঘরের দেয়াল সাধারণত সাদা রঙে ধোয়া। আর ছাদ শঙ্কু, গম্বুজ কিংবা পিরামিডের মতো দেখতে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ঐতিহ্যবাহী ত্রুল্লি তৈরিতে সিমেন্ট বা চুনের মিশ্রণ ব্যবহার করা হতো না। পাথর একটির ওপর আরেকটি বসিয়ে তৈরি করা হতো দেয়াল ও ছাদ। এই নির্মাণকৌশলকে বলা হয় শুষ্ক-পাথর নির্মাণ পদ্ধতি।

এই প্রাচীন নির্মাণপ্রথার শিকড় প্রাগৈতিহাসিক সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। আলবেরোবেল্লোর কিছু ত্রুল্লির ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো।

বর্তমানে এসব ঘরের কিছুতে মানুষ বসবাস করেন। আবার কিছু ত্রুল্লি রূপান্তরিত হয়েছে দোকান, রেস্তোরাঁ, জাদুঘর কিংবা পর্যটকদের থাকার জায়গায়।

দুই এলাকায় সবচেয়ে বেশি ত্রুল্লি

আলবেরোবেল্লোর ত্রুল্লি দেখতে চাইলে রিওনে মন্তি এবং আয়া পিকোলা এলাকায় যাওয়া যায়। এই দুই এলাকাতেই রয়েছে সবচেয়ে বেশি ঐতিহ্যবাহী ত্রুল্লি।

বিশেষ করে রিওনে মন্তির সরু ও ঢালু গলি ধরে হাঁটলে একের পর এক সাদা দেয়ালের ত্রুল্লি চোখে পড়বে। ধূসর পাথরের শঙ্কু আকৃতির ছাদ আর সাদা দেয়ালের সমন্বয়ে পুরো এলাকা দেখতে অনেকটা সিনেমার দৃশ্যের মতো।

চুনাপাথরের তৈরি এসব ঘরের দেয়াল সাধারণত সাদা রঙে ধোয়া (ছবি: সংগৃহীত)

শহরের উঁচু জায়গাগুলো থেকে তাকালে পুরো ত্রুল্লি পল্লির মনোমুগ্ধকর দৃশ্যও দেখা যায়।

ছাদে আঁকা রহস্যময় প্রতীক

আলবেরোবেল্লোর ত্রুল্লির আরেকটি আকর্ষণ হলো ছাদের ওপর আঁকা বিভিন্ন প্রতীক। অনেক ঘরের ছাদে সাদা রঙে ধর্মীয়, পৌরাণিক কিংবা লোকবিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত চিহ্ন দেখা যায়।

ছাদের একেবারে ওপরেও থাকে নানা ধরনের পাথরের অলংকার। এসব প্রতীকের সঙ্গে সৌভাগ্য কামনা কিংবা অশুভ শক্তি দূরে রাখার প্রাচীন বিশ্বাসের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়।

তাই আলবেরোবেল্লো ঘোরার সময় শুধু গলির দুই পাশের ঘর দেখলেই হবে না, একবার চোখ তুলে ত্রুল্লির ছাদগুলোর দিকেও তাকাতে হবে।

ইতিহাস জানতে ঘুরে দেখুন ‘ত্রুল্লো সোভারানো’

শহরের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে ত্রুল্লো সোভারানো। এটি একটি বিশেষ ধরনের দুইতলা ত্রুল্লি এবং আলবেরোবেল্লোর ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়, কয়েক শতাব্দী আগে পাথরের এই ঘরগুলো কীভাবে তৈরি ও ব্যবহার করা হতো। বাইরে থেকে ছোট মনে হলেও ভেতরের কাঠামো ও নির্মাণকৌশল বেশ চমকপ্রদ।

শুধু ছবি তোলার জায়গা নয়

আলবেরোবেল্লোর আকর্ষণ শুধু এর স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়। শহরের সরু পাথুরে রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতেই অনুভব করা যায় এখানকার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ।

ছোট ছোট দোকান, স্থানীয় খাবারের আয়োজন, হাতে তৈরি নানা পণ্য আর ত্রুল্লির ভেতরে গড়ে ওঠা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শহরটিকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

শহরের বিভিন্ন চত্বর, পুরোনো ভবন এবং স্থানীয় ইতিহাসের জাদুঘরও ঘুরে দেখা যায়।

ত্রুল্লির ভেতরেই রাত কাটানোর সুযোগ

আলবেরোবেল্লো ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে আরও বিশেষ করে তুলতে চাইলে ঐতিহ্যবাহী ত্রুল্লির ভেতরেই থাকার সুযোগ নিতে পারেন।

শহরে বেশ কিছু ত্রুল্লি এখন পর্যটকদের থাকার জন্য সাজানো হয়েছে। ফলে সাধারণ হোটেলের বদলে পাথরের ঐতিহ্যবাহী ঘরে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা নেওয়া সম্ভব।

দিনের বেলায় পর্যটকদের ভিড় থাকলেও সন্ধ্যার পর শহরের পরিবেশ অনেক শান্ত হয়ে আসে। তখন ত্রুল্লিগুলোর মাঝে হাঁটলে পাওয়া যায় অন্যরকম এক আবহ।

কখন যাবেন?

আলবেরোবেল্লোতে বছরের বিভিন্ন সময়ই ভ্রমণ করা যায়। তবে শহরের সরু গলি ও ত্রুল্লি পল্লি হেঁটে ঘুরে দেখতে চাইলে বসন্ত কিংবা শরৎকাল তুলনামূলক আরামদায়ক।

সকালে কিংবা বিকেলের দিকে ঘোরার সময় সাদা দেয়াল ও পাথরের ছাদের ওপর সূর্যের আলো-ছায়ার খেলা আরও সুন্দর দেখায়। ছবি তোলার জন্যও এই সময় বেশ উপযোগী।

স্থানীয় খাবারও চেখে দেখুন

আলবেরোবেল্লো যে অঞ্চলে অবস্থিত, সেই পুগলিয়া তার খাবারের জন্যও পরিচিত। তাই শহর ঘুরতে গিয়ে স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়াও হতে পারে ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্থানীয় পাস্তা, জলপাই তেল, তাজা সবজি, পনির এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক পদ চেখে দেখতে পারেন। ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে খাবারের অভিজ্ঞতা নিতে স্থানীয় ছোট রেস্তোরাঁ বেছে নেওয়াই ভালো।

কেন যাবেন আলবেরোবেল্লো?

ইতালির রোম, ভেনিস কিংবা ফ্লোরেন্সের মতো শহরগুলোর আকর্ষণ একরকম। আর আলবেরোবেল্লোর আকর্ষণ একেবারেই আলাদা।

এখানে আধুনিক শহরের ব্যস্ততার বদলে কয়েক শতাব্দী পুরোনো স্থাপত্য ঐতিহ্যের মধ্যে হাঁটার সুযোগ পাওয়া যায়। সাদা দেয়াল আর পাথরের শঙ্কু আকৃতির ছাদে সাজানো ত্রুল্লিগুলো শুধু দেখতে সুন্দর নয়, এগুলো দক্ষিণ ইতালির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাচীন নির্মাণকৌশলের জীবন্ত নিদর্শন।

এই অনন্য স্থাপত্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি হিসেবেই ১৯৯৬ সালে আলবেরোবেল্লোর ত্রুল্লি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় জায়গা করে নেয়।

রূপকথার মতো দেখতে একটি ইতালীয় গ্রামে হারিয়ে যেতে চাইলে তাই ভ্রমণ তালিকায় জায়গা দিতে পারেন আলবেরোবেল্লোকে।