ইতালির জনপ্রিয় পর্যটন মানচিত্রে মিলান, ভেরোনা কিংবা লেক গার্দার মতো গন্তব্যগুলো যতটা পরিচিত, ব্রেশিয়া ততটাই আড়ালে। অথচ ইতিহাস, শিল্প, স্থাপত্য, খাবার, ওয়াইন, পাহাড় ও হ্রদ ইতালির ভ্রমণে যা কিছু আকর্ষণীয়, তার অনেকটাই একসঙ্গে পাওয়া যায় এই শহরে। তাই উত্তর ইতালি ভ্রমণে ব্রেশিয়াকে এক দিনের জন্য হলেও তালিকায় রাখা যেতে পারে।
ইতিহাস আর প্রাণবন্ত জীবনের মিশেল
ব্রেশিয়ার প্রাণকেন্দ্রের অন্যতম আকর্ষণ কারমিনে এলাকা। একসময় যে অঞ্চলকে অপরাধপ্রবণ বলে মনে করা হতো, এখন সেটিই রঙিন দেয়ালচিত্র, ছোট বার, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় মানুষের আনাগোনায় প্রাণবন্ত।
কারমিনের একটি বারে কফি খেতে গিয়ে জানা যায়, দুই দশক আগেও এলাকাটি ছিল পতিতা ও চোরদের বিচরণস্থল। সময়ের সঙ্গে বদলেছে পরিস্থিতি। এখন এলাকা অনেক নিরাপদ, কিন্তু পুরোনো বোহেমিয়ান চরিত্রটি এখনও রয়ে গেছে।
ব্রেশিয়ার বাসিন্দাদের গর্বের আরেকটি দিক হলো স্থানীয় খাবার ও পানীয়। শহরের জনপ্রিয় পানীয় ‘পিরল’ স্থানীয় অ্যাপেরিতিফের পাশাপাশি কাছেই রয়েছে বিখ্যাত ফ্রানচিয়াকোর্তা ওয়াইন অঞ্চল।
মধ্যযুগীয় চত্বর থেকে সকালের পিৎজা
শহর ঘুরতে শুরু করলে প্রথমেই চোখে পড়বে পিয়াজা দেলা লোদজিয়া। মধ্যযুগীয় এই চত্বরের অন্যতম আকর্ষণ বিশাল ঘড়িঘর। এর ওপর থাকা মানুষের আকৃতির দুটি যান্ত্রিক মূর্তি শত শত বছর ধরে ঘণ্টা বাজিয়ে সময় জানান দিয়ে আসছে।
শহরের খাবারের স্বাদ নিতে চাইলে স্থানীয় পিৎজা অবশ্যই তালিকায় রাখা যায়। এক স্থানীয় পিৎজা কারিগরের রেস্তোরাঁয় বিশেষ ময়দা, মাখার পদ্ধতি ও বিভিন্ন ধরনের চিজ নিয়ে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল পাওয়া যায় পিৎজায়। স্থানীয় বিশেষত্ব বাগোস চিজও এতে ব্যবহার করা হয়।
আর মজার বিষয় হলো, এই পিৎজা উপভোগ করা যায় সকালের নাশতাতেও।
থিয়েটার, শিল্প আর অপেরার গল্প
ব্রেশিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন তিয়াত্রো গ্রান্দে। ১৭শ’ শতকে প্রতিষ্ঠিত এই থিয়েটার ইতালির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে পরিচিত।
থিয়েটারের অলংকৃত অভ্যন্তর, দেয়ালচিত্র ও ঐতিহ্যবাহী ক্যাফে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। এখানেই বিখ্যাত সুরকার পুচিনির মাদামা বাটারফ্লাই নতুন জীবন পেয়েছিল। মিলানের লা স্কালায় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ১৯০৪ সালে অপেরাটি ব্রেশিয়ায় মঞ্চস্থ হয় এবং ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।
ফ্যাসিবাদের ইতিহাসও আছে এখানে
ব্রেশিয়ার বিশেষত্ব শুধু সৌন্দর্য নয়, শহরটির সঙ্গে ইতালির রাজনৈতিক ইতিহাসও গভীরভাবে জড়িত।
পিয়াজা ভিত্তোরিয়ার বর্তমান স্থাপত্যে এখনও মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসনের ছাপ দেখা যায়। ১৯৩২ সালে তাঁর শাসনামলে চত্বরটির ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছিল। পুরোনো বাসিন্দাদের সরিয়ে সেখানে নির্মাণ করা হয় বিশাল স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্ন।
১৯৭০-এর দশকে ইতালির রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়াবহ অধ্যায়ও ব্রেশিয়াকে ছুঁয়ে যায়। ১৯৭৪ সালে পিয়াজা দেলা লোদজিয়ায় বোমা বিস্ফোরণে আটজন নিহত হন। সেই সময়ের স্মৃতি আজও শহরের বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত। দুর্গের দিকে ওঠার পথজুড়ে থাকা অসংখ্য স্মারকফলক সেই সময়ের নিহতদের স্মরণ করিয়ে দেয়।
‘ব্রেশিয়ার সিস্টিন চ্যাপেল’
ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়ের পর শহরের শিল্প ও ধর্মীয় স্থাপত্যের দিকে মন দেওয়া যায়। ১৬শ’ শতকের সান ক্রিস্তো গির্জা পরিচিত ‘ব্রেশিয়ার সিস্টিন চ্যাপেল’ নামে। কারণ গির্জার ভেতরের প্রায় প্রতিটি স্থান জুড়ে রয়েছে উজ্জ্বল ও দৃষ্টিনন্দন দেয়ালচিত্র।
এর কাছেই স্থানীয় খাবারের জন্য পরিচিত একটি পুরোনো খাবারের দোকানে মিলতে পারে কাসোনচেল্লি—সেজপাতা ও মাখন দিয়ে পরিবেশিত এক ধরনের রাভিওলি। আরেকটি স্থানীয় পদ মালফাত্তি, যা পাহাড়ি অঞ্চলের বিশেষ ধরনের গনোক্কি।
খাবারের দোকানটির মাঝখানে থাকা একটি রোমান স্তম্ভও কম আকর্ষণীয় নয়। স্তম্ভটির কিছু অংশ মাটির পাঁচ মিটার নিচে চলে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, স্তম্ভের ওপরের কারুকাজ করা অংশটি পাশের বাড়ির বাসিন্দারা কফির টেবিল হিসেবে ব্যবহার করেন!
মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা রোমান ইতিহাস
ব্রেশিয়ায় পুরোনো স্থাপনার নিচে ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যেন স্বাভাবিক ঘটনা। ১৯শ’ শতকের শুরুতে একটি রোমান স্তম্ভের নিচে খনন করে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা আবিষ্কার করেন বিশাল এক মন্দির-সমষ্টি। সেখানে পাওয়া যায় বিখ্যাত ব্রোঞ্জের ‘ডানাওয়ালা বিজয়’ মূর্তি, যেটিকে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর বলে মনে করা হয়।
বর্তমানে সেই এলাকা আংশিক ভূগর্ভস্থ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত। কাছের সান্তা জুলিয়া জাদুঘরেও রয়েছে রোমান যুগসহ বিভিন্ন সময়ের বহু প্রত্নবস্তু। জাদুঘরটি এত বড় যে পুরোটা দেখতে এক দিন লেগে যেতে পারে।
ফ্রানচিয়াকোর্তার ওয়াইনের স্বাদ
ব্রেশিয়া থেকে কিছুটা এগোলেই ফ্রানচিয়াকোর্তা। লেক ইসেওর দক্ষিণে আগ্নেয় মাটিতে গড়ে ওঠা এই ওয়াইন অঞ্চল স্পার্কলিং ওয়াইনের জন্য বিখ্যাত।
অন্য অনেক বিখ্যাত ইতালীয় ওয়াইন অঞ্চলের তুলনায় ফ্রানচিয়াকোর্তা এখনও তুলনামূলকভাবে আড়ালে। স্থানীয়দের কাছে অবশ্য এর জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই উৎপাদিত ওয়াইনের বড় অংশই স্থানীয় বাজারে খরচ হয়ে যায়।
লেক ইসেও ও মন্টে ইসোলা
ব্রেশিয়া থেকে প্রায় আধা ঘণ্টার পথ সুলজানো। লেক ইসেওর তীরে এই ছোট শহরটিকে রাতযাপনের ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়ে পরদিন ফেরিতে যাওয়া যায় মন্টে ইসোলা দ্বীপে।
পাহাড়ে ঘেরা দ্বীপটি ব্রেশিয়ার বাসিন্দাদের কাছে জনপ্রিয় দিনের ভ্রমণস্থল। পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও এখানকার স্থানীয় জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ছন্দ এখনও অটুট।
দ্বীপটির ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার সংস্কৃতিও বেশ আকর্ষণীয়। হাতে জাল তৈরির কারিগরি এখনও টিকে আছে। স্থানীয় কারিগরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই কাজ করে আসছেন। এমনকি ইতালির শীর্ষ ফুটবল লিগের অনেক গোলপোস্টের জালও এখানে তৈরি হয়।
হাতে তৈরি কাঠের নৌকার কারখানা
মন্টে ইসোলায় ভ্রমণের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হতে পারে ঐতিহ্যবাহী নৌকা তৈরির কারখানা দেখা। এখানে রাজপরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে ধনকুবেরদের জন্য হাতে তৈরি কাঠের নৌকা তৈরি করা হয়।
কারিগর আন্দ্রেয়া জানান, তাদের পূর্বপুরুষেরা ভেনিসে গন্ডোলা তৈরি করতেন। ১৬৪০ সালে তারা ব্রেশিয়া অঞ্চলে এসে স্থায়ী হন। কয়েক শত বছর পরও সেই কারিগরি ঐতিহ্য পরিবারের হাত ধরে টিকে আছে।
কেন যাবেন ব্রেশিয়ায়?
ব্রেশিয়ার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত এর বৈচিত্র্য। একই ভ্রমণে দেখা যায় মধ্যযুগীয় চত্বর, রোমান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ফ্যাসিবাদী স্থাপত্য, ঐতিহাসিক গির্জা, বিখ্যাত থিয়েটার, স্থানীয় খাবার, ফ্রানচিয়াকোর্তার ওয়াইন, লেক ইসেও এবং পাহাড়ঘেরা দ্বীপ।
মিলান বা ভেরোনার মতো অতিরিক্ত পর্যটকে ভরা নয় বলেই শহরটির আরেকটি সুবিধা স্থানীয় জীবনযাত্রার কাছাকাছি থেকে ইতালিকে অনুভব করার সুযোগ। উত্তর ইতালি ভ্রমণের পরিকল্পনায় তাই ব্রেশিয়াকে শুধু পথে পড়া একটি শহর হিসেবে না দেখে আলাদা একটি গন্তব্য হিসাবে রাখাই হতে পারে সেরা সিদ্ধান্ত।








