তারা দুদক কর্মকর্তা!

প্রতারণার দায়ে গ্রেফতার হওয়া প্রতারকরাগুলজার আলী, নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের যুগ্ম-পরিচালক (বন্দর)। গত ১০ জানুয়ারি তার কাছে একটি ফোন আসে। নিজেকে দুর্নীতি দমন কর্মকর্তা (দুদক) পরিচয় দিয়ে একজন বলেন, ‘আমি দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার পিএ রফিক বলছি। আপনি গুলজার আলী বলছেন। আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনেক তথ্য, অডিও-ভিডিও আমার হাতে আছে। আপনি যোগাযোগ করুন, প্রয়োজনে দেখা করুন।’ জবাবে গুলজার আলী ‘আমার কোনও দুর্নীতি নেই’ বলে ফোনটি কেটে দেন। এরপর তার কাছে আরও দু’টি নম্বর থেকেও কয়েকবার একই ধরনের ফোন আসে। দুর্নীতির সব তথ্য ধামাচাপা দিতে ভুক্তভোগী গুলজারের কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে গুলজার দুদককে বিষয়টি জানান।

গুলজারের কাছ থেকে টাকা নিতে না পারলেও ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫০০ সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি প্রতারক চক্র। দুদক কর্মকর্তাদের পরিচয় দিয়ে তারা প্রতারণা করতো।

গত ২৭ জানুয়ারি দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে র‍্যাব মহাপরিচালক বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠির তদন্তে নেমেই ১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে প্রতারক চক্রের মূলহোতাসহ দু’জনকে গ্রেফতার করে র‍্যাব-২। তারা হলো, আনিসুর রহমান ওরফে বাবুল (৩৬) ও ইয়াসিন তালুকদার (২৩)। তাদের কাছ থেকে ২১টি মোবাইল ফোন ও ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করা ২৬টি সিম উদ্ধার করা হয়।

 প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আনিসুর জানায়, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৫০০ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দুর্নীতির মামলা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রায় ৪০-৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তারা।

আনিসুরের বাড়ি মাদারীপুরের রাজৈর থানার লুন্দী গ্রামের মিয়া বাড়ী। বর্তমানে হাজারীবাগের বউ বাজারের ৪১১ সনাতন গড় এলাকায় থাকতো। তিনি এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তার সহযোগী ইয়াসিন তালকুদারের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার হামিরাদি গ্রামে। হাজারীবাগে তার সাইফুল এন্টারপ্রাইজ টেলিকম নামে একটি দোকান রয়েছে।

র‍্যাব-২ এর কোম্পানি কমান্ডার (সিপিসি-৩) পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন ফারুকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আনিসুর রহমান ২০১৪ সালে মাদারীপুরের রাজৈর এলাকায় তার এক গুরুর কাছে প্রতারণার হাতেখড়ি নেয়। তিন বছর তারা এক সঙ্গে কাজ করার পর আলাদা দলে বিভক্ত হয়। এই চক্রের আরও ৭-৮ জন সদস্য পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’ 

র‍্যাব-২ এর একজন কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের অভিযান জোরদারের পর থেকে তাদের মাথায় প্রতারণার ফন্দি আসে। এজন্য সরকারি টেলিফোন ডিরেক্টরি থেকে বিভিন্ন সরকারি দফতরের টেলিফোন ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করতে শুরু করে তারা। পরে বিভিন্ন দফতরে গিয়ে কর্মকর্তাদের সম্পর্কে সামান্য তথ্য সংগ্রহ করে আনতো। এরপর তাদের টার্গেট অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফোন দিয়ে দুর্নীতির মামলা বা মামলার তদন্ত চলছে বলে ভয়ভীতি দেখাতো। এতে কর্মকর্তাদের অনেকেই ভয় পেয়ে মামলা গায়েব করতে তাদের দাবি অনুযায়ী টাকা বিকাশে দিয়ে দিত।

এই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রতারক চক্রের সদস্যরা ঢাকা থেকে বিকাশে টাকা তুলতো। এছাড়া কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রবিশাল, বরগুনা থেকে টাকা তুলতো।  যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সহজে তাদের ধরতে না পারে।

ভুয়া সিম রেজিস্ট্রেশন ও বিকাশ অ্যাকাউন্ট তৈরির বিষয়ে আনিসুর জানায়, বিভিন্ন দোকানে নিম্নবিত্ত মানুষ নতুন সিম কিনতে গেলে তাদের কাগজপত্র দিয়ে সিমের ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করতো এবং তা দিয়ে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলতো। এছাড়াও বিভিন্ন সিম বিক্রির দোকান থেকে ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের সিম সংগ্রহ করে তা দিয়ে প্রতারণার কাজ করতো। কয়েকবার একটি সিম ব্যবহারের পর সেটি ফেলে দিত তারা।

গুলজার আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কিছুটা সন্দেহ হলে আমি দুদক কার্যালয়ে যোগাযোগ করি। ২০ জানুয়ারি দুদক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দেই। এ বিষয়ে পল্টন থানায় একটি মামলাও (নম্বর ৪৫) করেছি।

দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে একদল প্রতারক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন পেশায় কর্মকর্তাদের নামে কমিশনে কল্পিত অভিযোগ রয়েছে অথবা কমিশনের বিবেচনাধীন কোনও অভিযোগ হতে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলে টেলিফোনে অথবা মোবাইল ফোনে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দাবি করছে। কিন্তু এদের কথায় বা ফোনে বিভ্রান্ত হলে চলবে না। দুদক অসুন্ধান বা তদন্ত সংক্রান্ত কোনও বিষয়ে দুদক কর্মকর্তারা কোনও ব্যক্তির সঙ্গে লিখিত চিঠির বাইরে অন্যকোনও মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারবে না। এ বিষয়ে কমিশন থেকে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

কেউ যদি দুদকের কোনও কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে কারও সঙ্গে প্রতারণা করার চেষ্ঠা করে তাহলে থানা বা র‍্যাব কার্যালয় অথবা দুদকের পরিচালক (মনিটরিং) টেলিফোন- ৯৩৫২৫৫২  এবং মোবাইল নং-০১৭১১৬৪৪৬৭৫ নম্বরে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান তিনি।