দারোয়ান হাসান পরিচয়ে সারওয়ার আলীর বাসায় ঢোকে দুর্বৃত্ত





ডা. সারওয়ার আলীদারোয়ান হাসান হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলীর বাসায় ঢোকে এক দুর্বৃত্ত। সুঠাম দেহী, ফর্সা ও মুখভর্তি দাড়িওয়ালা ওই যুবক বাসায় প্রবেশ করেই সারওয়ার আলীকে ছুরি ধরে নিচে ফেলে দেয়; আর বলে, ‘জানে মেরে ফেলবো’। এ সময় সারওয়ার আলীর স্ত্রী এগিয়ে এলে তাকেও আঘাত করে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় তলার ভাড়াটিয়া সাহেব উদ্দিন চাকলাদার তাদের চিৎকার শুনে ওপরে উঠে আসেন। তাকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করে সে। এর পরপরই ওপরে আসেন সাহেব উদ্দিনের ছেলে মোবাশ্বের চাকলাদার। দুজন মিলে প্রতিহত করায় দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
গত ৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের একটি বাসায় সারওয়ার আলী ও তার পরিবারের সদস্যদের এভাবে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সারওয়ার আলী ও তার স্ত্রী ডা. মাখদোমা নারগিস মঙ্গলবার (৭ জানুয়ারি) বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তারা বলেন, ‘ভাগ্যের জোরে ও প্রতিবেশীর সহযোগীতায় আমরা আজ বেঁচে আছি।’
এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলায় বর্তমান দারোয়ান হাসান এবং গাড়িচালক হাফিজুল ইসলামকে দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সন্দেহভাজন হিসেবে মামলায় নাম উল্লেখ থাকা নাজমুল নামে সাবেক ড্রাইভার পলাতক রয়েছেন।
নাজমুলকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তপন কুমার সাহা। তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে নাজমুলের মোবাইল ফোন পাওয়া গেছে। যে নম্বর থেকে হাসান ও হাফিজুলের সঙ্গে অনেকবার কথা বলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
থানা পুলিশ ছাড়াও এ ঘটনায় ডিবি পুলিশ ও র‌্যাব ছায়া তদন্ত করছে বলে জানা গেছে। ডা. সারওয়ার আলী জানান, বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা এসে তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে গেছেন। পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারেও আশ্বস্ত করা হয়েছে।
দুর্বৃত্তরা প্রথমে প্রবেশ করে মেয়ের ফ্ল্যাটে
রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে দুই দুর্বৃত্ত প্রথমে সারওয়ার আলীর মেয়ের ফ্ল্যাটে ঢোকে। ছুরির মুখে মেয়ের স্বামী ও সন্তানকে জিম্মি করা হয়। সারওয়ার আলী বলেন, ‘মেয়ের কাছে ওরা জানতে চায়, আমি কোথায়? আমি চারতলার ফ্ল্যাটে আছি শুনে একজন ওপরে উঠে আসে। আর একজন ছুরি ধরে তিন জনকে আটকে রাখে।’
দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে সারওয়ার আলীকে নিচে ফেলে দেয় দুর্বৃত্ত
চারতলার দরজায় নক করার পর খুলতে যান সারওয়ার আলী। কোনও প্রশ্ন না করে দরজা খুলতে যাওয়ায় স্ত্রী ডা. মাখদোমা নারগিস বলেন, কে আসছে, জিজ্ঞেস করো? জিজ্ঞেস করা হলে বাইরে থেকে একজন বলে, ‘স্যার আমি হাসান।’ বাইরে লাইট বন্ধ থাকায় ডোর পিপহোল দিয়ে কে এসেছে তা দেখা যাচ্ছিল না। সারওয়ার আলী বলেন, ‘দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ধরে নিচে ফেলে দেয়। গলায় চাকু ধরতে যায়। আমি হাত নাড়া দিয়ে চাকুটি ফেলে দিই। এই অবস্থা দেখে আমার স্ত্রী ছুটে আসে। সে ডাকাত ডাকাত বলে চিৎকার করায় তাকে আঘাত করে নিচে ফেলে দেওয়া হয়।’
‘আমাদের চিৎকার আর শব্দ শুনে দ্বিতীয় তলায় চাকলাদার সাহেব ছুটে আসেন। তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। তিনি হাতে আঘাত পান। তিনি ও তার ছেলে আসার কারণে আমরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছি।’…বলছিলেন, ডা. সারওয়ার আলী।
শব্দে নাতির ঘুমে সমস্যা হচ্ছে জানাতে ওপরে যান চাকলাদার
সারওয়ার আলীর ফ্ল্যাট থেকে চিৎকার ও কাঠের জিনিস সরানোর শব্দ শুনে দ্বিতীয় তলার ভাড়াটিয়া সাহেব উদ্দিন চাকলাদারকে ওপরে গিয়ে কী হয়েছে তা দেখতে বলেন তার স্ত্রী। কী হয়েছে তা দেখার জন্য এবং নাতির ঘুমের সমস্যা হচ্ছে, বলার জন্য চতুর্থ তলায় ওঠেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সাহেব উদ্দিন চাকলাদার। তিনি দেখেন দরজাটি ভেজানো রয়েছে। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন, একজন যুবক সারওয়ার আলীর বুকের ওপর গলা চেপে ধরে বসে আছে।
সাহেব উদ্দিন চাকলাদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্যারের বুকের ওপর একজন বসে আছে দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে? জবাবে ওই যুবক জানায়, স্ট্রোক করেছেন। আমি বলি, উনি স্ট্রোক করলে আপনি বুকের ওপর উঠে আছেন কেন? এই প্রশ্ন করার পর পাশে পড়ে থাকা ছুরিটা কুড়িয়ে এনে আমার পেট বরাবর চালায়। হাত দিয়ে ডিফেন্স করতে গেলে, হাতে আঘাত পাই। এরপর আমি একটি চেয়ার নিয়ে অবস্থান নিই। এর মধ্যে ওপরে আসছি শুনে আমার ছেলেও চলে আসে। ও আসার পর বলি, বাবা ওই ব্যাটা আমাকে ছুরি মারছে। ধর ওরে। এই অবস্থা দেখে ছেলে একটি ছোট টেবিল দিয়ে মারতে যায়। টেবিলের ওপরের কাঁচ নিচে পড়ে ভেঙে যায়। এই শব্দে তৃতীয় তলায় অন্যদের জিম্মি করে রাখা দুর্বৃত্তরা ওপরে ছুটে আসে। আমি ওদের একজনকে জাপটে ধরি। আর ছেলে অন্যজনকে মারতে গেলে সে সিঁড়ি দিয়ে পালিয়ে যায়। তার চলে যাওয়া দেখে আমি যাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম সেও গা ঝাড়া দিয়ে পালিয়ে যায়।’
৯৯৯-এ কল দিলে ছুটে আসে পুলিশ
সারওয়ার আলীর মেয়ে, মেয়ের স্বামী ও নাতনিকে জিম্মি করে রাখে একজন। ওপরে চেচামেচির শব্দ শুনে কী হচ্চে দেখার জন্য উঁকি দেয় ছুরিধারী। আর এই সুযোগে তাকে ধাক্কা দিয়ে দরজার বাইরে বের করে ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেন সারওয়ার আলীর মেয়ে। দরজা লাগানোর পর জরুরি সেবা ৯৯৯- এ কল দেন এবং আশপাশের লোকজনকে জানান।
৯৯৯ এ কল পাওয়ার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশ বাসায় এসেছিল বলে জানান সারওয়ার আলী। তিনি বলেন, ‘পুলিশ খুব দ্রুত এসেছে। তারা আমাদের কাছ থেকে সব ধরনের তথ্য নিয়েছে,সহযোগীতা করছে।’
নিচের দুর্বৃত্তরা ওপরে এলে বাঁচতাম না
ডা. সারওয়ার আলীর বাসার গ্যারেজ থেকে একটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। ব্যাগটিত ৭টি চাপাতি পাওয়া গেছে; যেগুলোর মধ্যে চারটি ১২ ইঞ্চি ও তিনটি ৯ ইঞ্চি লম্বা ছিল। এছাড়া ওই ব্যাগের মধ্যে ওয়াটার হিটারের রড, আইপ্যাড, ক্যামেরার স্ট্যান্ড, সিনথেটিক দড়ি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান সারওয়ার আলী। তিনি বলেন, ‘আমরা পড়ে থাকা অবস্থায় একজনকে নিচে ফোন করতে শুনি। সে জিনিসগুলো নিয়ে ওপরে আসতে বলে। চাপাতি ও অন্য জিনিসসহ নিচের লোকজন ওপরে এলে আমরা বাঁচতাম না।’
যে কারণে ওপরে উঠতে পারেনি নিচের লোকজন
চারতলায় শব্দ শুনে দ্বিতীয় তলার ভাড়াটিয়া সাহেব উদ্দিন চাকলাদার ওপরে গেছেন শুনে তার ছেলে মোবাশ্বের চাকলাদার পিছু পিছু বের হন। প্রথমে তিনি বাসার নিচে যান। গিয়ে দেখতে পান, পুরো গেট খোলা। দারোয়ান হাসানকে কারণ জিজ্ঞেস করলে, তিনি জানান, স্যারের মেয়ের জামাই বাইরে গেছেন। সদুত্তর না পেয়ে চারতলায় উঠে আসেন মোবাশ্বের। ছেলে মোবাশ্বেরের বরাত দিয়ে এসব কথা জানান সাহেব উদ্দিন চাকলাদার। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা নিচের লোকজন যাতে সহজে ভেতরে ঢুকতে পারে, সেজন্য গেট খোলা রাখা হয়েছিল। ছেলে নিচে নামায় নিচের দুর্বৃত্তরা হয়তো আর ওপরে ওঠার সাহস করেনি।’
আরও পড়ুন...

সারওয়ারকে হত্যাচেষ্টা: দারোয়ান ও গাড়িচালক রিমান্ডে

সারওয়ার আলীকে হত্যাচেষ্টার মূল সন্দেহভাজন পলাতক, গ্রেফতার ২