ই-ভ্যালি পরিচালনায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় বোর্ড গঠন করায় আশার আলো দেখছেন গ্রাহকরা। কিন্তু ই-অরেঞ্জের গ্রাহকরা এখনও হতাশ। তাদের প্রায় হাজার কোটি টাকা লোপাট করা ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষের কেউ জেলে, কেউ পলাতক। নেপথ্যের মূল হোতা বনানী থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক শেখ সোহেল রানাও ভারতের জেলে বন্দি। তাকে ফিরিয়ে আনার প্রাথমিক চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহকদের অর্থ কোথায় সরানো হয়েছে তা সোহেলই বলতে পারবে। যে কারণে সোহেলকে ঘিরেই আটকে আছে তদন্ত।
১৭ আগস্ট ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে তাহেরুল নামে এক ব্যক্তি প্রথম মামলা দায়ের করেন। এরপর একে একে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অন্তত ২৪টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটও মানি লন্ডারিং আইনে একটি মামলা দায়ের করেছে। কিন্তু কোনও মামলার তদন্তেই অগ্রগতি নেই।
গুলশান থানায় দায়ের হওয়া প্রথম মামলায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমান, আমান উল্লাহ ও রাসেলসহ কয়েকজন কর্মকর্তা কারাবন্দি। প্রথমে তদন্ত করেছে গুলশান থানা পুলিশ। পরে মামলাটি সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে হস্তান্তর করা হয়।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) শিউলি আক্তার বলেন, ‘নতুন কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। তবে অভিযান চালানো হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ই-অরেঞ্জ গ্রাহকরা বলছেন, ই-অরেঞ্জ এর নেপথ্যে থেকে পুরো বিষয়টি পরিচালনা করেছিল বনানী থানার সাবেক পরিদর্শক তদন্ত শেখ সোহেল রানা। সামনে ছিল তার বোন সোনিয়া মাহজাবিন। গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের পর দায় থেকে বাঁচতে প্রতিষ্ঠানটি বিথী আক্তার নামের অজ্ঞাত এক নারীর কাছে হস্তান্তর করে তারা। একইসঙ্গে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলাও করিয়েছিল। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে শেখ সোহেল রানা দৃষ্টি ঘোরাতে এই ফন্দি এঁটেছিলেন। শেষ পর্যন্ত এক গ্রাহকের মামলায় তাদের পুরো কৌশল ভেস্তে যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সোহেল রানা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ স্থানান্তর না করে বেশিরভাগ সময় নগদ উত্তোলন করেছেন। অদিতি, বাবু, ফজলু, মিলন ও জোবায়ের নামের কয়েকজন ব্যক্তির নামেও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ তুলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক টের পেতে পারে এই শংকায় নগদ তুলতেন তিনি।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমের এক কর্মকর্তা জানান, ই-অরেঞ্জের বেশিরভাগ অর্থই বিদেশে পাচার হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। পুরো কাজটি করেছে সোহেল রানা। কিন্তু সে ভারতে বন্দি থাকায় তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
মামলা হওয়ার পর ২ সেপ্টেম্বর পালিয়ে নেপাল যাওয়ার পথে বাংলাদেশ-ভারতের উত্তর সীমান্তে বিএসএফের হাতে গ্রেফতার হয় শেখ সোহেল রানা। তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের পক্ষ থেকে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি (এনসিবি) মহিউল ইসলাম বলেন, ‘শেখ সোহেল রানাকে ফিরিয়ে আনতে ভারতীয় পুলিশের এনসিবি শাখায় তিনটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কোনও চিঠিরই জবাব আসেনি। পরে স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সোহেলকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।’
ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে প্রথম দায়ের করা মামলার বাদি ও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক তাহেরুল ইসলাম বলেন, ‘সোহেল রানাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রথম যখন মামলা হয় তখনই তাকে আটক বা গ্রেফতার করেনি পুলিশ। এমনকি তার বোন সোনিয়া যার কাছে ই-অরেঞ্জের মালিকানা হস্তান্তর করেছে বলে দাবি করেছে, সেই বিথীকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার প্রায় ১৭ লাখ টাকার অর্ডার করা ছিল। গিফট ভাউচার কেনা ছিল সাড়ে ৮ লাখ টাকার। টাকা ফেরত পাওয়ার আশা দেখছি না। ই-ভ্যালির মতো ই-অরেঞ্জের গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া উচিত সরকারের। না হলে আমরা পথে বসবো।’
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ই-অরেঞ্জের নতুন মালিক হিসেবে যে বিথি আক্তারের কথা বলা হচ্ছে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি সোহেল রানার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে জানা গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, সোহেল বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আগেই বিথী দেশ ছেড়েছেন। এ ছাড়া টাকা উত্তোলনকারী বাকিদেরও পরিচয় পাওয়া যায়নি।
ই-অরেঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক কমিউনিটির এক মুখপাত্র আরাফাত বলেন, ‘আমরা উচ্চ আদালতে রিট করার পরিকল্পনা করছি। আদালত যদি ই-ভ্যালির মতো কোনও আদেশ দেন, তবে কিছুটা আশা আছে।’