রাজধানীর কাফরুলে চলন্ত অবস্থায় মোটরসাইকেল চালকের মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটি ছিনতাইয়ের বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে পুলিশ বলছে, ছিনতাই নয়, মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় ইট নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া ঘটনায় জড়িত আরও দুজনকে গ্রেফতারে অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।
‘চালকের মাথায় আঘাত করে মোটরসাইকেল ছিনতাই’ শিরোনামে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গত মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ১ টা ২০ মিনিটের দিকে মোটরসাইকেলে নিজ বাসায় ফিরছিলেন ভুক্তভোগী রাফি। তিনি কাফরুল থানাধীন ইব্রাহিমপুর এলাকায় পৌঁছালে পূর্ব শত্রুতার জেরে রাফির মাথার ডান পাশে ইট দিয়ে আঘাত করে দুষ্কৃতকারীরা। এতে তিনি মাথায় গুরুতর রক্তাক্ত জখমপ্রাপ্ত হয়ে মোটরসাইকেল থেকে রাস্তায় পড়ে যান।
এ ঘটনায় রাফির চাচা নুর হোসেন চৌধুরী শুক্রবার (১২ জুন) বাদী হয়ে কাফরুল থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হামলার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। এ সূত্রে দুজনকে শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন মো. পারভেজ (৩০) ও আনোয়ার হোসেন বাবু (৩২)।
পুলিশ আরও জানায়, এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার অপর দুই আসামি মো. ফয়সাল ওরফে কালু এবং আমিন। এর মধ্যে আমিনকে র্যাব ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে। বাকি আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
শুক্রবার (১২ জুন) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার। তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার (১০ জুন) রাত আনুমানিক ১টা ২০ মিনিটে কাফরুলের পূর্ব শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডের প্রায় ১০০ গজ আগে ইব্রাহিমপুর পাকা সড়কে এ ঘটনা ঘটে। রাফি নামের ওই যুবক মোটরসাইকেলে করে বাসায় ফেরার পথে তাঁর ওপর পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়।
পূর্বশত্রুতার জেরে দুর্বৃত্তরা তার মাথার ডান পাশে সজোরে ইট নিক্ষেপ করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে মোটরসাইকেলসহ সড়কে ছিটকে পড়েন।
মোস্তাক সরকার বলেন, ঘটনার পর হামলাকারীরা বিষয়টি ধামাচাপা দিতে তাৎক্ষণিকভাবে একটি অটোরিকশায় করে আহত রাফিকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটি কাছের একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় আহত রাফির চাচা নুর হোসেন বাদী হয়ে কাফরুল থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন।
তিনি আরও বলেন, মামলার পর ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত চারজনকে শনাক্ত করা হয়। তদন্তের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (১১ জুন) কাফরুল থানার একটি দল ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়া থানার ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত পারভেজকে গ্রেফতার করে। একই সময়ে পুলিশের আরেকটি দল রাজধানীর ইব্রাহিমপুর এলাকা থেকে আনোয়ার হোসেন বাবুকে গ্রেফতার করে।
এ ছাড়া ঘটনাস্থলের অদূরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ভুক্তভোগীর মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে।
হামলার কারণ সম্পর্কে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, গ্রেফতার পারভেজ একসময় ভুক্তভোগী রাফির বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন। সে সূত্রে তাদের মধ্যে পরিচয় ছিল। পরে পারভেজ ও তার সহযোগীরা এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে রাফি তাতে বাধা দেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যায় রাফির সঙ্গে পারভেজ ও কালুর কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তারা রাফিকে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী পরদিন রাত ১টার দিকে পারভেজ, কালু, বাবু ও আমিন পূর্ব শেওড়াপাড়ায় ওত পেতে থাকেন। রাফি মোটরসাইকেল নিয়ে সেখানে পৌঁছালে আমিন তাঁর গতিরোধের চেষ্টা করেন। মোটরসাইকেল না থামিয়ে চলে যাওয়ার সময় পারভেজ ইট ছুড়ে তার মাথায় আঘাত করেন।
ডিসি মোস্তাক সরকার বলেন, ঘটনার পর আসামিরা পুরো বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালায়। তারা আশপাশের লোকজনকে বিভ্রান্ত করতে বলে, ওপর থেকে ইট পড়ে রাফি আহত হয়েছেন। এরপর তারা আহত রাফিকে অটোরিকশায় তুলে ইব্রাহিমপুর এলাকায় নির্জন স্থানে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
প্রধান অভিযুক্ত পারভেজ ও পলাতক ফয়সাল ওরফে কালুর বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারেও অভিযান অব্যাহত আছে।
এক প্রশ্নের জবাবে মোস্তাক সরকার বলেন, গ্রেফতার পারভেজ ও কালুর বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় আর্থিক বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় জড়িত আমিন এখনো পলাতক রয়েছেন।