ক্যামেরার চোখে শুধু ট্রাফিক, নাকি অপরাধীও? 

রাজধানীর ব্যস্ত মোড়গুলোতে নীরবে কাজ করছে নতুন এক ‘ডিজিটাল পুলিশ’। লালবাতি অমান্য করা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, কিংবা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে গাড়ি চালানোর মতো অপরাধ এখন মানুষের চোখে নয়, ধরা পড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) চোখে।

ঢাকার বিভিন্ন সড়কে পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা এআইভিত্তিক ক্যামেরাগুলো আপাতত ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করছে। তবে এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরও বড় এক সম্ভাবনার প্রশ্ন। একদিন কি এই ক্যামেরাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করবে শীর্ষ সন্ত্রাসী, পলাতক আসামি, কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘ওয়ান্টেড’ তালিকাভুক্ত অপরাধীদের?

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। কিন্তু ভবিষ্যতের স্মার্ট পুলিশিং ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবেও এই প্রযুক্তিকে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পুলিশের তালিকাভুক্ত লক্ষাধিক অপরাধী ও পলাতক আসামির তথ্য নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় এআই প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ চলছে। একইসঙ্গে পুরোনো সিসিটিভি নেটওয়ার্কেও ধীরে ধীরে যুক্ত করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ছয় মাসে রাজধানীর আরও প্রায় ৫০০ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে পুলিশের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল পয়েন্টে প্রায় ৮০টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করেছে। এসব ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনা শনাক্ত করছে। এর মধ্যে রয়েছে— লালবাতি অমান্য করা। স্টপলাইন অতিক্রম করা। উল্টো পথে গাড়ি চালানো। হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো। সিটবেল্ট ব্যবহার না করা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করে গাড়ি চালানো এবং অবৈধ পার্কিং। এসব এআই ক্যামেরা শুধু ভিডিও ধারণ করে না, সফটওয়্যারের মাধ্যমে আচরণ বিশ্লেষণ করে আইন লঙ্ঘনের ঘটনাও শনাক্ত করে।

পরিকল্পনার মাত্র ২০ শতাংশ বাস্তবায়ন

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা যে স্বপ্ন দেখি, তার প্রায় ২০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। এখনও অনেক পথ বাকি। সময় লাগবে, তবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’’ তিনি বলেন, ‘‘ক্যামেরাগুলো শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য নয়, অপরাধ তদন্তেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে।’’

আনিছুর রহমান বলেন, ‘‘ক্যামেরার সামনে যা ঘটে, সবই রেকর্ড হয়। কোনও অপরাধ সংঘটিত হলে ঘটনাস্থল ও আশপাশের ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা যানবাহনের গতিবিধি অনুসরণ করা সম্ভব।’’

পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষায়, বর্তমানে এটি মূলত ‘রিঅ্যাকটিভ পুলিশিং’—অর্থাৎ অপরাধ ঘটার পর তদন্তে সহায়তা করছে। কিন্তু ভবিষ্যতের লক্ষ্য ‘প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিং’, যেখানে অপরাধী শনাক্ত হবে ঘটনার আগেই।

ফেস রিকগনিশন: প্রযুক্তি কি করতে পারে?

ফেস রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এমন একটি ব্যবস্থা, যা একজন ব্যক্তির মুখের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তার পরিচয় নিশ্চিত করতে পারে। যেমন- পুলিশের ডাটাবেজে কোনও শীর্ষ সন্ত্রাসী বা পলাতক আসামির ছবি সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি কোনও ক্যামেরার সামনে এলেই সিস্টেম তার মুখের সঙ্গে ডাটাবেজের তথ্য মিলিয়ে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাঠাতে পারে। বিশ্বজুড়ে এটিকে বলা হয় ‘রিয়েল-টাইম ফেসিয়াল রিকগনিশন’।

বাংলাদেশ কি সেই পথে যাচ্ছে?

অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বর্তমানে চালু থাকা এআই ক্যামেরা প্রকল্পে ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি নেই।’’ তিনি বলেন, ‘‘এটি মূলত ডিএমপির ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। প্রযুক্তিগতভাবে অপরাধী শনাক্তকরণ সম্ভব হলেও প্রকল্পটি এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।’’ তবে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি দিয়ে অপরাধী শনাক্তে ব্যবহার করার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তার ভাষায়, সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা অপরাধীর ছবি ও তথ্য সিস্টেমে যুক্ত থাকলে তিনি কোনও এলাকায় প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা কী বলে

চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফেস রিকগনিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। দেশটির বহু শহরে গণপরিবহন, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন এবং সড়কে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফেস রিকগনিশন ব্যবহার করে। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারি নিয়ে এসব দেশে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।

বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ক্যামেরা বসালেই ফেস রিকগনিশন চালু করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন— লাখ লাখ মানুষের নির্ভুল তথ্যসমৃদ্ধ ডাটাবেজ। শক্তিশালী আইনি কাঠামো, তথ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার ও ডাটা সেন্টার এবং নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক অবকাঠামো।

ট্রাফিক ক্যামেরা থেকে স্মার্ট সিটি নিরাপত্তা

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান প্রকল্পটি মূলত একটি পাইলট উদ্যোগ। এটি সফল হলে ভবিষ্যতে গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ, সন্দেহভাজন যানবাহন ট্র্যাকিং, অপরাধ বিশ্লেষণ এবং সমন্বিত নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা সম্ভব হবে।

বর্তমান এআই ক্যামেরা হয়তো শুধু ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করছে। কিন্তু আগামী দিনের স্মার্ট পুলিশিং ব্যবস্থায় একই প্রযুক্তি পলাতক আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী কিংবা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘‘বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত, আইনি ও নৈতিক প্রস্তুতি কত দ্রুত নিতে পারে—সেটিই নির্ধারণ করবে রাজধানীর ক্যামেরাগুলো কেবল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র হয়ে থাকবে, নাকি একদিন স্মার্ট নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘পর্যাপ্ত জবাবদিহি ও আইনি সুরক্ষা ছাড়া এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’’