নিজ বাসায় ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন সুলতানাকে ধর্ষণের পর হত্যা ও তার বাবা ইলিয়াস চৌধুরীকে হত্যার ঘটনায় করা দুটি মামলা একসঙ্গে বিশেষ বেঞ্চে শুনানি চেয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) বাদী পক্ষের আইনজীবী সৈয়দ আসাফুর আলী রাজা এ আবেদন জানান বলে নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, প্রায় এক যুগ আগে খুলনার লবণচোরা এলাকায় সংঘটিত ধর্ষণ ও ডাবল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা দুটি মামলার বিচার করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের রায়ে মামলার পাঁচ আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে নিয়ম অনুসারে ওই মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতে ডেথ রেফারেন্স আসে হাইকোর্টে।
সাত বছর পর দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য পাঠানো হয় হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে। কিন্তু দুটি মামলার মধ্যে একটি মামলার বিচার দণ্ডবিধিতে হওয়ায় তার ডেথ রেফারেন্স না শুনে কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ। তবে দুটি মামলার বিচার যেন বিশেষ বেঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সেজন্য প্রধান বিচারপতি বরাবর একটি আবেদন দিয়েছেন মামলার বাদী।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুটি মামলা একই ঘটনা হতে উদ্ভূত। সাক্ষ্য-প্রমাণ একই। পৃথক পৃথক বেঞ্চে বিচার কাজ হলে ভিকটিমের পরিবার ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। সেজন্য দণ্ডবিধিতে করা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স বিশেষ বেঞ্চে শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানানো হলো।
এর আগে ২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খুলনার লবণচোরা এলাকার বুড়ো মৌলভীর দরগাহ পাড়ায় ঢাকাইয়া হাউজে বাবা ইলিয়াস চৌধুরী ও তার মেয়ে পারভীন সুলতানাকে ধর্ষণ ও হত্যা করে পাঁচ আসামি। হত্যার পর তাদের লাশ সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেওয়া হয়। পরে আসামিরা দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় প্রথমে লবণচোরা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় একটি হত্যা মামলা করেন পারভীনের ভাই রেজাউল আলম চৌধুরী বিপ্লব।
মামলার তদন্ত পর্যায়ে গ্রেফতার করা হয় আসামি লিটনকে। গ্রেফতারের পর আসামি লিটন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সেখানে উঠে আসে হত্যার আগে ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন ধর্ষণ করে আসামিরা। পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এই জবানবন্দির পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায় ঘটনার চারদিন পর ২২ সেপ্টেম্বর ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে আরেকটি মামলা করা হয়। দুটি মামলার বিচার হয় খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এ। সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে দুটি মামলায় রায় দেওয়া হয়।
রায়ে পারভীন ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি লিটন, সাইফুল ইসলাম পিটিল, আবু সাঈদ, আজিজুর রহমান ওরফে পলাশ ও শরিফুল আলমকে মৃত্যুদণ্ড এবং প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। আর ইলিয়াস চৌধুরী হত্যা মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় এই পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ২০১ ধারায় লাশ গুমের অভিযোগে সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে বিচারিক আদালত কর্তৃক দেওয়া এই রায় কার্যকরে ডেথ রেফারেন্স আসে হাইকোর্টে।
দীর্ঘ সাত বছর পর দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চেকে শুধুমাত্র নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলা সংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তির এখতিয়ার প্রদান করা হয়। ফলে ইলিয়াস চৌধুরী হত্যা মামলাটি দণ্ডবিধির আওতায় হওয়ায় ডেথ রেফারেন্সটি কার্যতালিকা থেকে মঙ্গলবার বাদ দেয় হাইকোর্ট।
এরপর বুধবার প্রধান বিচারপতি বরাবর আবেদন দেন মামলার বাদী। ওই আবেদনে একই ঘটনা হতে উদ্ভূত দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স বিশেষ বেঞ্চে একত্রে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের আইন কর্মকর্তা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক বলেন, মামলা দুটি একই ঘটনা থেকে উদ্ভূত। সাক্ষ্য-প্রমাণ একই। দুটি বেঞ্চে বিচার কাজ হলে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন মামলার বাদী। ন্যায় বিচারের স্বার্থে একই বেঞ্চে মামলা দুটির ডেথ রেফারেন্স একত্রে শুনানি ও নিষ্পত্তি হওয়া দরকার।
একই মত প্রকাশ করে বাদীর আইনজীবী সৈয়দ আসাফুর আলী রাজা বলেন, বিশেষ বেঞ্চে দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য যাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন প্রধান বিচারপতি। সেজন্য আমরা একটি আবেদন দাখিল করেছি। এখনও সিদ্ধান্ত পাইনি।