অর্থঋণ আইনের নিলাম চ্যালেঞ্জে রিট গ্রহণযোগ্য নয় : হাইকোর্টের রায়

অর্থঋণ আদালত আইনের অধীনে ব্যাংক কর্তৃক পরিচালিত নিলাম প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সরাসরি রিট আবেদন করার কোনও সুযোগ নেই বলে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।

বুধবার (২৯ জুলাই) এ টি এম আশরাফুল ইসলাম হেলাল বনাম বাংলাদেশ এবং অন্যান্য মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি থেকে হাইকোর্টের এ পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে জানা গেছে। গত ১৬ জুলাই বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া এবং বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

এ মামলায় আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ আহসান। ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার জোর্তিময় বড়ুয়া। অন্য দুই বিবাদীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মাহবুবুর রহমান কিশোর।

রায়ে আদালত বলেন, ‘‘অর্থঋণ আদালত আইনের ১২(৩) ধারার অধীন শুরু হওয়া নিলাম প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে রিট পিটিশন দায়েরের আইনি সুযোগ নেই—বিবাদীপক্ষের এমন যুক্তি গ্রহণ করে ইস্যুকৃত রুল এবং দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাতিল ও প্রত্যাহার করেছেন উচ্চ আদালত।

রায়ে আদালত বলেছেন, ‘‘নিলামে বিক্রি সম্পন্ন হয়ে ক্রেতার নামে দলিল রেজিস্ট্রি ও নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন হলে তাতে ক্রেতার চূড়ান্ত স্বত্ব তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে আইনি সময়সীমা পার হওয়ার পর রিট আবেদনের মাধ্যমে সেই নিলাম বাতিল বা সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই।’’

মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালে একটি ব্যাংক থেকে রিট আবেদনকারী এ টি এম আশরাফুল ইসলাম হেলাল ৩০ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বকেয়া পরিশোধ না করায় পাওনা দাঁড়ায় ৪২ লাখ ৮০ হাজার ৭৪৫ টাকা। ঋণ আদায়ে ব্যাংক ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে নিলামের মাধ্যমে ৭০ লাখ টাকায় উক্ত সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা সম্পত্তিটি কিনে নেন এবং ২০২২ সালের জুন মাসে তাদের নামে বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি ও খতিয়ানে নামজারি সম্পন্ন হয়।

এরপর এ টি এম আশরাফুল ইসলাম হেলাল সম্পত্তির হস্তান্তর প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত শর্ত সাপেক্ষে রুল জারি ও হস্তান্তর প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ দেন। তবে শর্ত ছিল—৯০ দিনের মধ্যে পুরো বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে হবে, অন্যথায় রুল ও স্থগিতাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু রিটকারী পুরো বকেয়া পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। এরপর আদালত সে রিট আবেদন খারিজ করে রায় দেন।

আদালত বলেন, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১২(৩) ও ১২(৮) ধারা অনুযায়ী নিলামের বিরুদ্ধে বিকল্প আইনি প্রতিকারের স্পষ্ট সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করায় আগের রুল ও স্থগিতাদেশ আইনত আগেই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে নিলাম ক্রেতাদের নামে দলিল রেজিস্ট্রি ও নামজারি হওয়ায় তাদের অখণ্ডনীয় স্বত্ব তৈরি হয়েছে, যা রিটের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা যায় না।

রায়ে আদালত বলেন, ‘‘রুল জারির সময় আদালতের বেধে দেওয়া ৯০ দিনের মধ্যে রিট আবেদনকারী বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। রুলের আদেশের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর থেকে উক্ত রুল ও স্থগিতাদেশ আইনত আর কার্যকর ছিল না। নিলামে বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার পর আইনানুগভাবে দলিল রেজিস্ট্রি ও খতিয়ানে নামজারি হয়ে যাওয়ায় নিলাম ক্রেতাদের অনুকূলে আইনগত চূড়ান্ত স্বত্ব অর্জিত হয়েছে। তাই এখন আর এই নিলাম বাতিল করে রিট আবেদনকারীকে সম্পত্তি ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়।

আদালত আরও বলেন, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১২(৮) ধারায় নিলাম সংক্রান্ত অনিয়ম বা সংক্ষুব্ধতার জন্য অন্য ফোরামে স্পষ্ট আইনি প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। তাই আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আইনগত বিকল্প প্রতিকার বহাল থাকা অবস্থায় এ রিট আর চলে না। অর্থ্যাৎ রিট প্রয়োগের গ্রহণযোগ্যতা নেই। তবে ব্যাংক কর্তৃক সমস্ত বকেয়া পাওনা কেটে নেওয়ার পর অবশিষ্ট যদি কোনও অতিরিক্ত টাকা জমা থাকে, তা অবিলম্বে রিট আবেদনকারীকে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।