সবুজবাগে বিএনপির সেই কর্মী হত্যার নেপথ্যে কী? 

রাজধানীর সবুজবাগের বাগপাড়া পানির পাম্প সংলগ্ন এলাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কর্মী ইব্রাহীম পলাশ (৩২) হত্যার রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। সেই সঙ্গে এই ঘটনায় জড়িত  ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

গ্রেফতারকৃতরা হলেন— মো. নাঈম, মো. আলী, হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা মো. মোস্তফা হোসেন রয়েল এবং তার অন্যতম সহযোগী মো. সবুজ। তারা ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। 

পুলিশ বলছে, ইব্রাহীম পলাশকে হত্যার কয়েকদিন আগে গ্রেফতার সবুজের ভাগ্নে তানভীর স্থানীয় একটি রিকশা গ্যারেজে মূত্র ত্যাগ করেন। এই ঘটনায় গ্যারেজের ম্যানেজার তাকে মারধর করেন। পরে এর জের ধরে সবুজ গ্যারেজের ম্যানেজারকে মারধর করেন। বিষয়টি নিয়ে গ্যারেজ মালিক রসুল বিএনপি কর্মী ইব্রাহীম পলাশের কাছে বিচার চাইলে পলাশ লোকজন নিয়ে সবুজকে ধাওয়া দেন। হামলা থেকে বাঁচতে সবুজ গ্রেফতার মোস্তফা হোসেন রয়েলের বাসায় আশ্রয় নেন এবং একপর্যায়ে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে দেয়াল টপকে পালিয়ে যান। এ সময় পলাশের সঙ্গে রয়েলের বাকবিতণ্ডা হয়। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে পলাশ রয়েল এবং রয়েলের বাবা-মায়ের ওপর হামলা চালান। এতে রয়েল ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

ওই ঘটনার জের ধরে প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে রয়েল তার সহযোগীদের নিয়ে ইব্রাহীম পলাশের দুই হাত বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২১ জুলাই সন্ধ্যায় রয়েল ও তার সহযোগীরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে বাগপাড়া পানির পাম্প সংলগ্ন সোহাগের চায়ের দোকানের সামনে থাকা ইব্রাহীম পলাশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। 

হামলার সময় মোস্তফা হোসেন রয়েল দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রথমে ইব্রাহীম পলাশকে কোপ দেন। পলাশ ঠেকানোর চেষ্টা করলে তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর পলাশ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে রয়েলসহ তার সহযোগীরা তাকে ধাওয়া করেন। কিছুদূর যাওয়ার পর ইব্রাহীম পলাশ রাস্তায় পড়ে গেলে রয়েল ও তার সহযোগীরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কোপান এবং পলাশের দুই হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। হামলা শেষে তারা বিচ্ছিন্ন হাত দুটি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। স্থানীয় লোকজন গুরুতর অবস্থায় ইব্রাহীম পলাশকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

ঘটনার পরপরই সবুজবাগ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের অবস্থান বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ, বিভিন্ন স্থানে অভিযান এবং অন্যান্য গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করে। তদন্তে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। 

পুলিশের অভিযানে হত্যাকাণ্ডে জড়িত নাঈম ও আলীকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া পুলিশের ধারাবাহিক তৎপরতা ও অভিযানের মুখে মোস্তফা হোসেন রয়েল ও সবুজ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। 

পরে গ্রেফতারকৃতদের দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি দেশীয় ধারালো অস্ত্র (ছ্যানা) উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে নিহত ইব্রাহীম পলাশের ডান হাতের বিচ্ছিন্ন বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং গ্রেফতারকৃতদের দেখানো মতে ডান হাতের অবশিষ্ট অংশ (কবজিসহ) উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার আলামত আইনানুগ প্রক্রিয়ায় জব্দ করা হয়েছে। 

ডিএমপির মতিঝিল জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশিদ জানান, গ্রেফতার ও আত্মসমর্পণকারী চার আসামির দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধারকৃত আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং অন্যান্য তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তদন্তে পুরো ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে এবং হামলায় অংশগ্রহণকারী সকল সহযোগীকেও ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এবং পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের স্বার্থে তাদের পরিচয় এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।