প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিবসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সিল, স্বাক্ষর ও অফিসিয়াল লেটারহেড জাল করে প্রতারণার অভিযোগে একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। চক্রটির কাছ থেকে জালিয়াতির কাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ আলামত জব্দ করা হয়েছে।
গ্রেফতাররা হলেন—চক্রের হোতা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার মো. ফারুক হোসেন (৪১), সাকিব খান (২৫), মাসুম মুনসী, মীর তৌহিদুল ইসলাম ও মো. বকুল মণ্ডল (৩৫)।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকালে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কিছু নথি তদন্তের জন্য ডিবির কাছে পাঠানো হয়। তদন্ত, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় মঙ্গলবার মাদারীপুরের কালকিনি থেকে ফারুক হোসেন ও সাকিব খানকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই এলাকা থেকে মীর তৌহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। পাশাপাশি ডিবির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কালকিনি থানা থেকে মাসুম মুনসীকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে কুষ্টিয়া মডেল থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় বকুল মণ্ডলকে।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল লেটারহেডের চার বান্ডিল, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নামে তৈরি ৪১টি জাল সিল, প্রতারণায় ব্যবহৃত আটটি মোবাইল ফোন, দুটি ডেস্কটপ কম্পিউটার এবং একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চক্রের মূল হোতা ফারুক হোসেন ২০০৬ সালে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রকল্পে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৪ সালে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর পুনর্বহালের উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর নামে জাল সিল, স্বাক্ষর ও অফিসিয়াল লেটারহেড ব্যবহার করে নথি তৈরি করেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নামে ব্যবহৃত ‘প্রায়োরিটি’ সিলেরও নকল তৈরি করে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করতেন। পরে তিনি একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্র গড়ে তুলে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণামূলক তদবির শুরু করেন।
তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, চক্রটি প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তার ছবি ব্যবহার করে একটি ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করত এবং চাকরি পুনর্বহালের জন্য চাপ দেওয়ার চেষ্টা করত। একই কৌশলে মলদোভায় জনশক্তি রপ্তানিসংক্রান্ত একটি জাল সুপারিশপত্রও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপনের তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবির তথ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে চক্রটি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব ও সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে জাল সিল, স্বাক্ষর ও অফিসিয়াল লেটারহেড তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রভাব বিস্তার এবং তদবির-বাণিজ্য চালিয়ে আসছিল। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্যাড, জাল সুপারিশপত্র ও ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা আদায়েরও চেষ্টা করছিল তারা।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, গ্রেফতার সাকিব খান বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরে কার কী সমস্যা আছে, তা খুঁজে বের করতেন এবং সম্ভাব্য ‘ক্লায়েন্ট’ সংগ্রহের কাজ করতেন।
তিনি আরও জানান, তৌহিদুল বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরের নথির খসড়া কম্পিউটারে প্রস্তুত করতেন। তার কম্পিউটারে ফারুক হোসেনের নামে একটি ফোল্ডারও পাওয়া গেছে। আর মাসুমের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ৪১টি জাল সিল।
আরেক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি চক্রটির সঙ্গে কোনও মন্ত্রণালয় বা সরকারি দপ্তরের কেউ জড়িত আছেন কিনা, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।