গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূইয়া হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চেকিং পয়েন্ট পার হওয়ার ঘটনায় দুই স্ক্রিনারের দায়িত্বে গাফিলতি পেয়েছে তদন্ত কমিটি। বিমানবন্দরের নিজস্বভাবে গঠিত ওই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দুই স্ক্রিনিং অপারেটরকে শাস্তির আওতায় আনার জন্য বেবিচক সদর দফতরে লিখিতভাবে সুপারিশ করা হয়েছে।
ওই দুই অপারেটর হলেন, হেভি লাগেজ গেট-৬-এর দায়িত্বে থাকা স্ক্রিনার সিপাহি মহিনুর এবং ব্রিজ সি-১-এ দায়িত্বে থাকা স্ক্রিনার অ্যাসিসট্যান্ট সিকিউরিটি অফিসার আরিফুর রহমান।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ঘটনার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের, অন্যটি বেবিচক সদর দপ্তর থেকে বিভাগীয়ভাবে গঠিত। ইতোমধ্যে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদন সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত কমিটি স্ক্রিনারদের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে। এ কারণে তাদের দুজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে স্ক্রিনারসহ নিরাপত্তায় নিয়োজিত সবাইকে নিরাপত্তা বিষয়ে ব্রিফ করা হয়েছে। নিরাপত্তা ও নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।
আলোচিত এ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে দেশের সব বিমানবন্দরকে বেবিচক সদর দপ্তরের নিরাপত্তা বিভাগ থেকে বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়। নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।
আগামী ২৬ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও)-এর নিরাপত্তাবিষয়ক অডিট রয়েছে। এর আগে বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় এমন ঘটনা নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।
বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এ বিষয়টি সিরিয়াসভাবে নিই। দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি হয়। একটি আমাদের বিভাগীয়, অন্যটি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের।’
‘আমরা প্রথমে দেখি, আমাদের সিস্টেমে কোনো সমস্যা ছিল কি না। অপরদিকে ব্যক্তির দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না। আমরা একটি রিপোর্ট হাতে পেয়েছি। সে অনুযায়ী আগামী সপ্তাহের কর্মদিবসের মধ্যে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের সব বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বিমানবন্দরের নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভা থেকে ভিআইপি, সিআইপিদের নিরাপত্তায় যেন কোনো ছাড় না হয়, সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা সেটিও বাস্তবায়ন করছি।
যা বলা হয়েছে শাহজালালের তদন্ত প্রতিবেদনে
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৬ জুলাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের (ফ্লাইট বিজি-৩৯৭) ঢাকা থেকে দিল্লি যাওয়ার জন্য আশিয়ান গ্রুপের নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া, তার ছেলে আরিদিন ভূঁইয়া এবং মেয়ে নুসরাত জুবাইয়ারা দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে ঢোকেন।
তারা ‘চেক-ইন’ করতে ‘ডি’ লাইনে যান। ‘চেক-ইন ও ইমিগ্রেশন’ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে চূড়ান্ত নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য বোর্ডিং ব্রিজ ‘সি-০১’-এ যান তারা। চূড়ান্ত নিরাপত্তা তল্লাশি শেষে পৌনে ২টায় তাদের ফ্লাইট ছেড়ে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তারা দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের ব্যাগ স্ক্যানিং করে আনুমানিক ৩১ রাউন্ড তাজা গোলাবারুদের সদৃশ বস্তু দেখা যায়। ব্যাগে থাকা গোলাবারুদ নিশ্চিত হওয়ার পর দিল্লি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে অবগত করে।’
দিল্লি বিমানবন্দরের কাছ থেকে ঘটনা জানার পর ঢাকায় তদন্ত শুরু করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওইদিন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কর্মরত জিএসএ মিজানুর রহমান এবং জিএসএস সাইফুল ইসলাম বিমানবন্দরের বাইরে থেকে অবৈধ প্রোটোকলের মাধ্যমে হেভি লাগেজ গেট-৬ দিয়ে তাদেরকে (ছেলে-মেয়েসহ নজরুল ইসলাম) বিমানবন্দরের ভেতরে ঢোকান।
ওই সময়ে হেভি লাগেজ গেট-৬-এর দায়িত্বে থাকা স্ক্রিনার সিপাহি মহিনুর যাত্রীর ব্যাগে থাকা তাজা গোলাবারুদ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হন। তবে যাত্রীর ব্যাগ স্ক্রিনিংয়ের সময় তিনি মনোযোগ দিয়ে মনিটরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ী নজরুল ও তার ছেলে-মেয়েরা বোর্ডিং ব্রিজ সি-১-এ নিরাপত্তা তল্লাশি এবং ব্যাগ স্ক্যানিং প্রক্রিয়া শেষ করেন। সেখানে দায়িত্বে থাকা স্ক্রিনার এএসও আরিফুর রহমানও ব্যাগে থাকা তাজা গোলাবারুদ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হন।
উপরন্তু, আরিফুর রহমান স্ক্রিনিং কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় দায়িত্বে অবহেলা করে যাত্রী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কুশল বিনিময় এবং করমর্দন করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানবন্দরে কর্মরত স্ক্যানিং মেশিন অপারেটরদের দ্বারা তাজা গোলাবারুদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু ছেড়ে দেওয়া বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।