বাংলাদেশে জঙ্গিরা 'সেল' গঠনের চেষ্টা করছে বলে জাতিসংঘ সতর্ক করছে। পুলিশ বলছে, তাদের কাছে এমন কোনও তথ্য নেই। কাউন্টার টেররিজমের শীর্ষ কর্মকর্তারাও এ নিয়ে কথা বলতে চাইছেন না। অথচ কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও আশপাশে উদ্ধার হচ্ছে বোমা ও বিস্ফোরক। এ নিয়ে কথা বলতে না চাইলেও ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে মাঠের পুলিশকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতার নির্দেশ, বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।
ঠিক এমন সময়েই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের মাথাচাড়া নিয়ে এসেছে সতর্কবার্তা। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞ দল বলছে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ বা ‘একিউআইএস’ বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ছোট ও গোপন ‘সেল’ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে বাংলাদেশে আল-কায়েদার ঘাঁটি তৈরি হয়ে গেছে— এমন কিছু বলেনি তারা। কোনও সক্রিয় সেলের অবস্থানও চিহ্নিত করেনি। ফলে এটি সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে একটি আগাম সতর্কবার্তা বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
‘সেল’ কী ?
বড় কোনো একক ঘাঁটি বা ইউনিটের পরিবর্তে অত্যন্ত ছোট, বিচ্ছিন্ন এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ‘স্লিপার সেল’ বা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় সেটাকেই মূলত ‘সেল’ বলা হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, একিউআইএস লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের উদ্দেশ্যে সেল গঠনের জন্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
এই সতর্কতা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন মাত্র সাড়ে ৩ মাস আগে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছিল— বাংলাদেশে এখন আর জঙ্গি তৎপরতা নেই। অন্যদিকে গত কয়েক সপ্তাহে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের পর পুলিশ আবার মাঠপর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং উগ্রবাদ ও জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে।
জাতিসংঘ প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের ৩৮তম প্রতিবেদনে একিউআইএস-কে দক্ষিণ এশিয়ার একটি ক্রমবিকাশমান আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একিউআইএস আগের তুলনায় বিচ্ছিন্ন একটি সংগঠন থেকে আঞ্চলিক নেটওয়ার্কে রূপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা লজিস্টিক ও আর্থিক যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করছে। বড় ইউনিটের বদলে ছোট, ছড়িয়ে থাকা এবং বিকেন্দ্রীভূত সেলকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লায় হামলার ঘটনাও প্রতিবেদনে একিউআইএস-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এরপরই বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, দেশের ভূখণ্ড কাজে লাগিয়ে সেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে জাতিসংঘ বাংলাদেশে একিউআইএস-এর কোনও নির্দিষ্ট ঘাঁটির ঠিকানা দেয়নি, কোনও সক্রিয় সেলের অবস্থান বা সদস্যসংখ্যাও প্রকাশ করেনি। অর্থাৎ এটি প্রতিষ্ঠিত ঘাঁটির ঘোষণা নয়; বরং একটি আগাম গোয়েন্দা সতর্কতা বা থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট। তাই ‘বাংলাদেশে আল-কায়েদার ঘাঁটি’ বলার চেয়ে ‘সেল গড়ার চেষ্টা নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ’ বলাই তথ্যগতভাবে বেশি নির্ভুল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের বক্তব্য ছিল, ‘দেশে জঙ্গিবাদ নেই’
জাতিসংঘের এই মূল্যায়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্যের কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘দেশে বর্তমানে কোনও জঙ্গি তৎপরতা নেই’। এমনকি ‘জঙ্গিবাদ’ শব্দটিও তিনি স্বীকার করেন না বলে মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, অতীতে শব্দটি রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেছিলেন, অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উগ্র বা কট্টরপন্থী উপাদান থাকতে পারে।
কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ডে আবার ভিন্ন সতর্কতার চিত্রও দেখা যায়। গত ২৪ মে তিনি অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কার্যক্রম পরিদর্শন করে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস মোকাবিলায় এটিইউর অপারেশনাল সক্ষমতা, আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন। সরকার আধুনিক ও সমন্বিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা গড়ছে বলেও তখন জানানো হয়। পরে এটিইউ এবং সিটিটিসিকে একীভূত করে স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট (এসএসইউ) গঠন করছে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে একিউআইএসের বাংলাদেশে ‘সেল’ গড়ে তোলার চেষ্টার বিষয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। তাঁর মতে, জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে, এমন ধারণা করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারত্ব বজায় রাখতে হবে, যাতে অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজনরা কোনও ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়ে পরে নিজেদের ‘ভিকটিম’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ না পান।
নূর খান লিটন বলেন, ‘সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতিটা খুব ভালো মনে হচ্ছে না। আমাদের প্রথম সতর্কতাটি হওয়া উচিত; জঙ্গিবাদ একেবারে নির্মূল হয়ে গেছে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে শুধু উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়, যেকোনও ধরনের উগ্রগোষ্ঠীর উত্থানের শঙ্কা তৈরি হতে পারে।’
তবে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু কর্মকৌশল নিয়েও মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে বিস্ফোরকের পাশাপাশি প্রায় নিয়মিতভাবে লিফলেট, প্রচারপত্র বা জঙ্গিবাদী পুস্তিকা উদ্ধারের যে বর্ণনা দেওয়া হতো, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করেন তিনি।
নূর খান লিটন বলেন, ‘বিগত দিনে আমরা বহু ঘটনায় দেখেছি, বোমা বা বিস্ফোরকের সঙ্গে একই জায়গা থেকে লিফলেট বা প্রচারপত্র উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যারা সশস্ত্র বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তারা কি একই জায়গায় বিস্ফোরকের সঙ্গে ৫০, ১০০ বা ২০০টি লিফলেটও প্রস্তুত করে রাখবে? প্রায় প্রতিটি ঘটনায় একই ধরনের বর্ণনা আসলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করে।’
তার মতে, জঙ্গিবিরোধী অভিযানে প্রমাণ সংগ্রহ, গ্রেফতার এবং আলামত উদ্ধারের ক্ষেত্রে আইনানুগ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় প্রকৃত অপরাধী বা জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে নিজেকে ‘ভিকটিম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘জঙ্গিদের এমনভাবে মোকাবিলা করতে হবে, যাতে তারা কোনোভাবেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভিকটিম না হন। কারণ অভিযানের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সম্ভাব্য অপরাধীই শেষ পর্যন্ত ভিকটিমের জায়গায় চলে যেতে পারেন। বিগত দিনে এই ভুল বারবার হয়েছে। এই জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।’
অতীতের বিভিন্ন গ্রেফতার ও অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ওঠা অভিযোগের উদাহরণও দেন নূর খান লিটন। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় কাউকে গ্রেফতারের পর তার পকেটে গাঁজা পাওয়া গেছে; এমন বক্তব্য আমরা শুনেছি। আবার বোমার সঙ্গে লিফলেট পাওয়ার কথাও প্রায় নিয়মিত এসেছে। এ ধরনের বর্ণনা যদি বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে পুরো অভিযানই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।’
নূর খান লিটনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জঙ্গিবাদের ঝুঁকি অস্বীকার করা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি সেই ঝুঁকি মোকাবিলার নামে প্রশ্নবিদ্ধ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী কৌশল গ্রহণ করাও বিপজ্জনক। তার ভাষায়, ‘হুমকিকে গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু সেটি করতে হবে আইন মেনে, গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এবং এমনভাবে, যাতে প্রকৃত অপরাধী কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভুলের সুযোগ নিয়ে নিজেকে ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করতে না পারে।’
এখন কী করছে পুলিশ
জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের সময়েই দেশের ভেতরে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের কয়েকটি ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদী তৎপরতা ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং মাঠপর্যায়ের পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিশেষ মতবিনিময় সভা এবং ডিএমপির জুলাই মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির ও ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ এ নির্দেশ দেন।
সভায় নিরাপত্তাচৌকি বসিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশি, টহল জোরদার এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর চলাচলের ওপর নজর বাড়াতে বলা হয়। বিট ও কমিউনিটি পুলিশিং আরও কার্যকর করার পাশাপাশি পুলিশের সদস্য ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করছেন, এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ যোগ করেছে। কোথাও যেন হামলাকারীরা বোমা বা বিস্ফোরক রাখার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে একিউআইএসের সেল গঠনের চেষ্টা সম্পর্কে কোনও তথ্য নেই বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনও তথ্য নেই।
অন্যদিকে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হকের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘এটা রাষ্ট্রীয় বিষয়। এ বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচিন হবে না।’
তবে গত ২৭ জুলাই ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ শামসুল হক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘দেশে বর্তমানে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দেওয়ার মতো কোনও আশঙ্কা নেই’। ওইদিন তিনি জানিয়েছিলেন, উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গোয়েন্দা তথ্য ও নিজস্ব ডাটাবেজের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে।
তবে এসব বোমা উদ্ধারের সঙ্গে একিউআইএস কোনো যোগসূত্র আছে কিনা সেটা পুলিশ কিংবা আিইন শৃঙ্খলা বাহিনী এখনও নিশ্চিত করেনি। ফলে জাতিসংঘের প্রতিবেদন আর বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাকে এক করে দেখানোর সুযোগ নেই বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।









