আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি মানুষের

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যেকোনো প্রশাসনের জন্যই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ এখনও কাটেনি, বরং চাঁদাবাজি ও সহিংসতার ঘটনায় অস্বস্তি বিরাজ করছে। স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তা ফেরাতে চাঁদাবাজি বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং নিরপেক্ষ অভিযান পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া জরুরি বলছেন অনেকেই। দেশের মানুষ এখন শান্তিতে বাঁচতে চান এবং দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা আশা করেন।

এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের ১৮০ পূর্ণ হলো ১৬ আগস্ট। এই ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগই বেশি দেখছেন মানুষজন।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এখনও খুনোখুনি বন্ধ হয়নি। কমেনি অপরাধ নিয়ে মানুষের ভয়। একের পর এক প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড আলোচনায় আসছে। রাজনৈতিক কোন্দল ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যাচ্ছে প্রাণ। আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই নিয়ে ঘটছে খুনোখুনি। চাঁদাবাজি ও দখল-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হচ্ছে। পাশাপাশি ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ছিনতাই, চুরি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধও জনমনে নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলছে।

তবে অপরাধের সব সূচক একই হারে বাড়েনি। কোথাও কোথাও মামলার সংখ্যা কমেছে। কিন্তু সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলার মূল্যায়নে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। পুলিশ সদর দদফতরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যানের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সারা দেশে ছয় মাসে ১ হাজার ৭৮৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫৮৫টি। অর্থাৎ ওই ছয় মাসে হত্যা মামলা বেড়েছে প্রায় ১২ দশমিক ২ শতাংশ।

রাজনৈতিক ও স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই, জমি দখল, ব্যবসা ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিরোধ, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শত্রুতা—সবকিছু মিলেই হত্যার ঘটনাগুলো ঘটছে। এর সঙ্গে নতুন উদ্বেগ হয়ে যুক্ত হয়েছে পেশাদার অপরাধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা।

ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ঢাকা রেঞ্জে ৪০৪টি এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৩৬১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। রাজশাহী রেঞ্জে ১৮৩টি, খুলনায় ১৬৭টি, ময়মনসিংহে ১১৫টি, রংপুরে ১১৩টি, সিলেটে ১১২টি এবং বরিশালে ৯৬টি হত্যামামলা হয়েছে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনঘনত্ব বেশি এমন এলাকাতেই সহিংস অপরাধ বেশি হচ্ছে। ঢাকা ও আশপাশে জমি, ব্যবসা, পরিবহন, মাদক, চাঁদাবাজি এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী সক্রিয়। একই ধরনের বাস্তবতা রয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলেও।

পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারি–জুলাইয়ের হিসাবে ছয় মাসে ডাকাতির ঘটনায় ২৬৫টি মামলা হয়েছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৯০৪টি। চুরিসহ বিভিন্ন ধরনের চুরির মামলা হয়েছে ৬ হাজার ৩৯৯টি। তবে উদ্বেগজনক নারী ও শিশু নির্যাতনের হিসাব। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এই সময়ে ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়েছে। অন্যান্য অপরাধে মামলা হয়েছে আরও ৪১ হাজার ৯২৫টি।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, মামলার সংখ্যা অপরাধের পূর্ণ চিত্র নয়। কারণ সব অপরাধ থানায় মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। আবার মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি কখনও কখনও অভিযোগ গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধিরও প্রতিফলন হতে পারে। ফলে শুধু সংখ্যা নয়, অপরাধের প্রকৃতি, পুনরাবৃত্তি, অপরাধীদের দুঃসাহস এবং নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধসহ সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা জরুরি। তারা বলছেন, গত ছয় মাসে এমন কিছু অপরাধ ঘটেছে, যা শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, সমাজের মানবিকতা ও নৈতিক অবস্থার প্রশ্নও সামনে এনেছে।

গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। প্রতিবেশী সোহেল রানা শিশুটিকে নিজের বাসায় নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে বলে তদন্তে উঠে আসে এবং পরে সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়। দ্রুত বিচার শেষে সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ধরনের প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।

রাজধানীতেও গত কয়েক মাসে তালিকাভুক্ত অপরাধী ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাদের লক্ষ্য করে একাধিক সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যার পর পুলিশও প্রাথমিকভাবে অপরাধী চক্রগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখেছে। এ ধরনের ঘটনাগুলো বড় সংকেত দেয় যে, অপরাধ এখন শুধু সুযোগসন্ধানী নয়–কোথাও কোথাও তা পরিকল্পিত, সংগঠিত এবং অস্ত্রনির্ভর।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অপরাধজগতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া বা দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী আবার সক্রিয় হয়েছে—এমন তথ্য গোয়েন্দাদের কাছেও রয়েছে। বিদেশে থাকা অপরাধীদের একটি অংশও দেশে বা দেশের অপরাধচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের দাবি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলাকার নিয়ন্ত্রণ। সরকার বদলের পর কোথাও পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী দুর্বল হয়েছে। নতুন গোষ্ঠী সেই জায়গা নিতে চেয়েছে। বাজার, পরিবহন, ফুটপাত, নির্মাণকাজ, বালু ও জমি ব্যবসা, মাদক এবং চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব যখন রাজনৈতিক পরিচয় বা আশ্রয় পায়, তখন সাধারণ অপরাধ দ্রুত সংগঠিত অপরাধে পরিণত হয়।

পুলিশ এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাহিনীগুলোর সক্রিয়তায় এখনও ঘাটতি রয়েছে।’ তিনি মনে করেন, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘মব’ বা সংঘবদ্ধ জনতার মাধ্যমে কাউকে আক্রমণ, অপদস্থ, দখল বা শাস্তি দেওয়ার যে সংস্কৃতি দৃশ্যমান হয়েছিল, তার রেশ এখনও রয়েছে। আইন ভাঙলেও খুব বেশি কিছু হবে না—এমন ধারণা অপরাধীদের একাংশের মধ্যে সাহস তৈরি করেছে।

ড. তৌহিদুল হকের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও দখল-বাণিজ্যের মতো অপরাধ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ সক্রিয়তার বিকল্প নেই। পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় যেন কোনও অপরাধীর ঢাল হতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘কারও রাজনৈতিক পদ-পদবি থাকলে বা ক্ষমতাসীন দলের কারও সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ দ্বিধায় পড়বে— এমন ধারণা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’

অপরাধীর পেছনে প্রভাব ও সুরক্ষা থাকছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের পর্যবেক্ষণেও সামনে এসেছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন। তার ভাষ্যমতে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় নতুন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এই প্রতিযোগিতায় কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পেশাদার অপরাধী পর্যন্ত ভাড়া করা হচ্ছে।’ চাঁদাবাজি ও প্রটেকশন মানির অর্থনীতিও অপরাধকে টিকিয়ে রাখছে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউনকে রেজাউল করিম বলেন, ‘ছিনতাই বা চুরি অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির অপরাধ নয়। পেছনে সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক থাকে। কেউ ধরা পড়লে তাকে ছাড়িয়ে আনা, আইনি সহায়তা দেওয়া বা আবার অপরাধে ফেরানোর ব্যবস্থাও কোনও কোনও চক্র করে।’

তার মতে, একই অপরাধী বারবার অপরাধে জড়াচ্ছে কেন—সেই প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি। দ্রুত শনাক্তকরণ, তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত না করলে অপরাধী চক্র আরও সাহসী হবে।

পুলিশ বলছে, অপরাধ বেড়েছে বলা ঠিক হবে না

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের মূল্যায়ন কিছুটা ভিন্ন। পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘গত কয়েক বছরে হত্যার হার মোটামুটি একই ধরনের প্রবণতার মধ্যে রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১০টি হত্যার ঘটনা ঘটছে। এসব কমাতে পুলিশ প্যাট্রলিং, গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ বাড়িয়েছে।’

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলামও মনে করেন, সামগ্রিকভাবে অপরাধ বেড়েছে—এভাবে বলা ঠিক হবে না। তিনি মনে করেন, হত্যা মামলার সংখ্যা গত কয়েক বছরেও কাছাকাছি ছিল। বিচ্ছিন্ন কিছু রাজনৈতিক কোন্দলে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ এসব ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে এবং অনেক ঘটনায় রহস্য উদঘাটন ও আসামি গ্রেফতার সম্ভব হয়েছে।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনও অপরাধের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।’

প্রযুক্তি আছে, প্রশ্ন প্রতিরোধে

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, হত্যার তদন্তে এখন প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড, লোকেশন, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে অনেক হত্যার রহস্য দ্রুত উদঘাটন করা সম্ভব হচ্ছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, খুনের পর খুনি শনাক্ত করা অবশ্যই পুলিশের সাফল্য। কিন্তু খুনটাই যাতে না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করাই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বড় পরীক্ষা।