গুম ঠেকাতে মৃত্যুদণ্ড-ক্ষতিপূরণ, ‘স্বাধীন তদন্ত’ নিয়ে উদ্বেগ

গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করা হলে, মরদেহ পাওয়া গেলে কিংবা পাঁচ বছর পার হওয়ার পরও তিনি জীবিত না মৃত; তার কোনও সন্ধান না মিললে দায়ী ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে মৃত্যুদণ্ড। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবার পাবেন ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার। থাকবে রাষ্ট্রীয় অর্থে আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও। পরিবারকে দিতে হবে তদন্তের তথ্য, স্বীকৃতি পাচ্ছে ‘সত্য জানার অধিকার’। মামলা তদন্ত ও বিচার শেষ করার সময়ও বেঁধে দেওয়া হচ্ছে।

গুম প্রতিরোধে এমন কঠোর ও বিস্তৃত বিধান রেখেই জাতীয় সংসদে উঠেছে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’। তবে আইনটি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে এখন সাজা নয়; গুমের তদন্ত কে করবে, সেই প্রশ্ন। কারণ প্রস্তাব অনুযায়ী, গুমের অভিযোগ যেসব আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে উঠতে পারে, তাদের কোনও একটি বাহিনীকেই শেষ পর্যন্ত আরেক বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া যাবে। প্রয়োজনে সরকার আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলও করতে পারবে। তবে স্বাধীন কোনও স্থায়ী ‘গুম তদন্ত কর্তৃপক্ষ’ বা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিজস্ব তদন্ত ব্যবস্থাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

এক্ষেত্রেই আপত্তি মানবাধিকারকর্মী, গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর। তাদের প্রশ্ন, এক বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্য বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়াই কি ‘স্বাধীন তদন্ত’? বিশেষ করে বিগত সময়ে গুমের ঘটনায় যখন একাধিক সংস্থার যৌথ ভূমিকা, এক বাহিনীর পরিচয়ে অন্য বাহিনীর অভিযান কিংবা বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে গুম কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধানে।

রবিবার (৩০ আগস্ট) গুমের শিকার ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক দিবস। এর তিন দিন আগে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিলটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন। ওইদিনই বিলটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

বিগত দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিস্যাপিয়ারেন্স’-এ যোগ দেয়। কনভেনশনটি বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হয় ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর।

এর প্রায় দুই বছর পর একই আন্তর্জাতিক দিবসকে সামনে রেখে প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থেকে দেশের নিজস্ব আইনের বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে—বাংলাদেশ কি শুধু গুমকে অপরাধ ঘোষণা করবে, নাকি এমন তদন্তব্যবস্থাও গড়বে, যেখানে অভিযুক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রভাব থাকার সুযোগ থাকবে না।

কঠোর সাজা, কিন্তু প্রশ্ন তদন্তে

সংসদে উত্থাপিত বিলে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ করার প্রস্তাব রয়েছে। সাধারণ গুমের অপরাধে ন্যূনতম তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের ফলে ব্যক্তির মৃত্যু হলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা ঘটনার পাঁচ বছর পরও তাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন অথবা ন্যূনতম পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার সুযোগ রাখা হয়েছে। গোপন আটককেন্দ্র স্থাপন বা ব্যবহার, আলামত ধ্বংস, অপরাধে সহায়তা, প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় বা ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র বিধানও রাখা হয়েছে।

তবে খসড়া থেকে সংসদে ওঠার পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে তদন্তে। নতুন ১৪(৩) ধারায় স্পষ্ট করা হয়েছে, কোনও শৃঙ্খলা-বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ হলে সেই বাহিনী নিজে ওই অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না। সরকার তদন্ত দিতে পারবে অন্য কোনও শৃঙ্খলা-বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে। খসড়া আইনে এই সুরক্ষা ছিল না। ফলে আপাতদৃষ্টিতে সংসদে যাওয়া বিলটি তদন্তের ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়েছে। কিন্তু মানবাধিকারকর্মীরা এতে সন্তুষ্ট নন।

তারা বলছেন, গুমবিরোধী কনভেনশনের ১২(৪) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে এমন ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে, যাতে গুমের ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তি তদন্তকে চাপ, ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের মাধ্যমে প্রভাবিত করার অবস্থানে না থাকেন। জাতিসংঘের গুমবিষয়ক কমিটি বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট করে বলেছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা তার ইউনিট যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তদন্তে প্রভাব ফেলতে না পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

‘প্রথমেই কীভাবে জানা যাবে কোন বাহিনী তুলে নিয়েছে?’

জাতীয় প্রেসক্লাবে গুম প্রতিরোধ দিবসের একটি অনুষ্ঠানে নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গুম প্রতিরোধ আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন— দুটি আইনেরই বড় দুর্বলতা হলো স্বাধীন তদন্তের সুযোগ সীমিত রাখা। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কার্যকর ও স্বার্থের সংঘাতমুক্ত তদন্তের নিশ্চয়তা নেই।

তিনি বলেন, আইনে বলা হচ্ছে যে বাহিনী অভিযুক্ত, সেই বাহিনী তদন্ত করতে পারবে না। কিন্তু সাদা পোশাকে কাউকে তুলে নেওয়া হলে শুরুতেই আপনি জানবেন কীভাবে কোন বাহিনী অভিযুক্ত? বাস্তবে এখানেই বড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে। সরকার বলছে তারা গুম করবে না। কিন্তু যদি সত্যিই গুম না করার অঙ্গীকার থাকে, তাহলে স্বাধীন তদন্তের দরজা পুরোপুরি খোলা রাখতে আপত্তি কোথায়? আইনে ফাঁক রেখে দিলে ভবিষ্যতে কেউ না কেউ সেই সুযোগ ব্যবহার করবে।

‘একজন পুলিশ কর্মকর্তা কতটা স্বাধীন?’

মানবাধিকারকর্মী ও গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করা নূর খান লিটনও মনে করেন, গুমের মতো সংঘবদ্ধ ও জটিল অপরাধের অনুসন্ধান সাধারণ পুলিশি তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রকৃত সত্য বের করা কঠিন হতে পারে।

তার মতে, অতীতের অনেক গুম এমনভাবে সংঘটিত হয়েছে, যেখানে একজনকে তুলে নেওয়া, আটকে রাখা, জিজ্ঞাসাবাদ, স্থানান্তর এবং শেষ পর্যন্ত হত্যা বা ছেড়ে দেওয়ার কাজে আলাদা আলাদা দল যুক্ত ছিল। কখনও এক বাহিনী তথ্য দিয়েছে, অন্য একটি দল তুলে নিয়েছে, আবার পরবর্তী ধাপে এসেছে আরেক দল।

নূর খান লিটন বলেন, এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে, যেখানে একই অপারেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করা ব্যক্তিরা একে অপরকেও চিনতেন না। ফলে প্রচলিত একটি হত্যা বা অপহরণ মামলার মতো করে গুম তদন্ত করলে পুরো ‘চেইন’ বের করা অত্যন্ত কঠিন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, পুলিশের একজন সাধারণ তদন্ত কর্মকর্তা কতটা স্বাধীনভাবে সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল বা কোনও বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন?

নূর খান লিটন বলেন, গুম তদন্তের প্রতিষ্ঠানকে এমন ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে তারা যে কোনও বাহিনীর কর্মকর্তা বা সাবেক কর্মকর্তাকে তলব করতে পারে, আটককেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারে, ডিজিটাল ডেটা ও নথি সংগ্রহ করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে বাহিনীর কমান্ড কাঠামোর বাইরেও অনুসন্ধান চালাতে পারে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কমিশন যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বাধীন অনুসন্ধানই করতে না পারে এবং শেষ পর্যন্ত পুলিশ বা আরেক বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে এমন কমিশনের কার্যকারিতা কোথায়?

মিরাজ শেখের ঘটনা এখন ‘টেস্ট কেস’

স্বাধীন তদন্তের বিতর্কের মধ্যেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো সামনে আনছে বাগেরহাটের মোংলার মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১০ এপ্রিল মোংলার জয়মনি এলাকা থেকে জেলে ও মোটরসাইকেল রাইডার মিরাজ শেখকে সাদা পোশাকের ব্যক্তিরা তুলে নিয়ে স্থানীয় কোস্ট গার্ডের পন্টুনে নেয়। পরে স্পিডবোটে করে দ্বিগরাজ কোস্ট গার্ড ঘাঁটির দিকে নেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। এরপর থেকে তার অবস্থান জানা যায়নি। স্বজনরা বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে গেছেন; আদালত থেকেও তাকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সংগঠনটি বলছে, অভিযোগটি সত্য হলে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পালাবদলের পর এটি নতুন করে গুমের একটি গুরুতর অভিযোগ। সংস্থাটির প্রশ্ন— কোস্ট গার্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুলিশ বা অন্য কোনও নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে তদন্ত করলেই কি প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে?

মানবাধিকারকর্মী নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, তারাও মোংলায় গিয়ে পরিবার, স্থানীয় মানুষ ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ডিজিটাল প্রমাণসহ তদন্তে কী করা হয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন। তিনি বলেন, মিরাজ শেখকে হয় ফিরিয়ে দিতে হবে, নয়তো তার সঙ্গে কী ঘটেছে সেটি প্রকাশ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নেই। এ কারণেই মানবাধিকারকর্মীদের একাংশ ঘটনাটিকে নতুন আইনের আগেই রাষ্ট্রের জন্য একটি ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি টেস্ট’ হিসেবে দেখছেন।

স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা অপরিহার্য

শনিবার (২৯ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএস বলেছে, শুধু গুমকে অপরাধ ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। অতীতের গুমের বিচার এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরোধ; দুটির জন্যই স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা অপরিহার্য।

সংস্থাটি চায়, আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে সংশ্লিষ্ট বাহিনী কিংবা অন্য কোনও শৃঙ্খলা-বাহিনীর পরিবর্তে স্বাধীন তদন্ত কর্তৃপক্ষ, স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অথবা বিশেষ গুম তদন্ত সংস্থাকে ক্ষমতা দেওয়া হোক।

সংস্থাটি আরও বলছে, শুধু তদন্ত নয়; আটকের মুহূর্ত থেকে ডিজিটাল কাস্টডি রেজিস্টার, পরিবার ও আইনজীবীকে দ্রুত অবহিত করা, আটককেন্দ্রে সিসিটিভি, স্বাধীন পরিদর্শন, সাক্ষী ও অভিযোগকারীর নিরাপত্তা এবং ‘আয়নাঘর’সহ গোপন আটককেন্দ্রের আলামত ও ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে।

আসক যা বলছে

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরের গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গুমের অবসানে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সংস্থাটি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও খসড়ার কিছু বিধান নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। আইনটি চূড়ান্ত করার আগে ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করলে তা আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে করে আসক।

ক্ষতিপূরণে রাষ্ট্রেরও দায়

তদন্ত ঘিরে বিতর্ক থাকলেও ভুক্তভোগীর অধিকারের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বিলটিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনে বিশেষ তহবিল করা হবে। অপরাধীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে নির্ধারিত ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেও সেই অর্থ বহন করতে হবে।

দীর্ঘ সময় নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় তার স্বামী বা স্ত্রী ও নির্ভরশীল সদস্যরা সম্পত্তি থেকে ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের সুযোগ পাবেন। পাঁচ বছর পার হলে উত্তরাধিকারসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ‘গুম সনদ’ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

তদন্ত ও বিচার উভয়ের জন্য সর্বোচ্চ ১২০ দিনের কাঠামো রাখা হয়েছে; প্রাথমিকভাবে ৯০ দিন, যুক্তিসংগত কারণে আরও ৩০ দিন। এর পাশাপাশি গুমসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অনুপস্থিতিতে বিচার এবং ডিজিটাল আলামত ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।

‘সত্য জানার অধিকার’ই পরিবারের বড় প্রশ্ন

আইনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ‘রাইট টু ট্রুথ’ বা সত্য জানার অধিকার। গুমের ক্ষেত্রে পরিবারের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা অনেক সময় মৃত্যু নয়, বরং অনিশ্চয়তা। মানুষটি জীবিত কি না, কোথায় আটক ছিলেন, তার সঙ্গে কী ঘটেছে, কারা তাকে নিয়ে গেছে এবং রাষ্ট্রের কাছে কী তথ্য রয়েছে— কোনও কিছুর উত্তর না পাওয়া।

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বিলে সেই জায়গায় পরিবারকে তদন্ত ও ঘটনার প্রকৃত তথ্য জানার অধিকার দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তল্লাশি পরোয়ানা জারি করে নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার ক্ষমতাও আদালতকে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সত্য জানার অধিকার কাগজে স্বীকৃত থাকলেই চলবে না। যে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি সত্য খুঁজবে, সেই প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিরই যদি প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা না থাকে, তবে ‘রাইট টু ট্রুথ’ শেষ পর্যন্ত কার্যকর অধিকার হওয়ার বদলে ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

অতীতের এক হাজার ৫৬৯ গুমের ছায়া

আইনটি এমন এক সময়ে সংসদে এসেছে, যেখানে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধান রাষ্ট্রের সামনে অতীতের একটি বড় পরিসর তুলে ধরেছে। কমিশনের কাছে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ এসেছিল। যাচাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুমের সংজ্ঞার আওতায় রাখা হয়। এর মধ্যে ২৫১ জনের অবস্থান তখনও শনাক্ত করা যায়নি এবং ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অতীতের এসব মামলায় শুধু সরাসরি তুলে নেওয়া সদস্যদের বিচার করলেই চলবে না। কার নির্দেশে অভিযান হয়েছে, কে অনুমোদন দিয়েছেন, কারা জানতেন এবং জেনেও প্রতিরোধ করেননি; কমান্ড চেইনের সেই দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। সংসদে উত্থাপিত বিলে কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে আইনের প্রয়োগে বড় প্রশ্ন হবে— এই ধারা মাঠপর্যায়ের সদস্যের বাইরে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে কি না।

ভবিষ্যতে রাষ্ট্র যেন গুমকে অস্ত্র না বানায়

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের আগের দিন শনিবার (২৯ আগস্ট) দেওয়া বিবৃতিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদও অতীতের প্রতিটি গুমের সত্য উদঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, যারা এখনও নিখোঁজ তাদের অবস্থান ও পরিণতি প্রকাশ এবং পরিবারকে ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দিতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের কোনও সংস্থা যেন নাগরিকের বিরুদ্ধে গুমকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

২০ বছর পর কনভেনশনের বার্তা ‘ভিকটিমস ফার্স্ট, অ্যাকশনস নাউ’

২০০৬ সালে গৃহীত আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী কনভেনশনের ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে ৩০ আগস্ট রবিবার। জাতিসংঘের গুমবিষয়ক কমিটি এ উপলক্ষে ২০২৬ সালের প্রচারাভিযান চালাচ্ছে “ভিকটিমস ফার্স্ট, অ্যাকশনস নাউ” স্লোগানে— ভুক্তভোগীকে কেন্দ্রে রেখে অঙ্গীকারকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে।

বাংলাদেশের জন্য সেই বার্তা এবার বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ আন্তর্জাতিক সনদে যোগ দেওয়ার দুই বছরের মাথায় দেশে গুমের স্থায়ী আইন তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিলটিতে কঠোর সাজা আছে, ক্ষতিপূরণ আছে, পরিবারের সত্য জানার অধিকার আছে, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি আছে এবং অভিযুক্ত বাহিনীকে নিজের বিরুদ্ধে তদন্তের সুযোগ না দেওয়ার নতুন সুরক্ষাও আছে। তারপরও আইনটির তদন্তের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

তারা বলছেন, নতুন আইন কতটা শক্তিশালী, সেটি মৃত্যুদণ্ডের বিধান দিয়ে বিচার হবে না। বিচার হবে— মিরাজ শেখের মতো একজন মানুষ নিখোঁজ হলে রাষ্ট্র কত দ্রুত তাকে খুঁজে বের করতে পারে; পরিবারকে সত্য জানাতে পারে কি না; একজন কনস্টেবল থেকে সাবেক জেনারেল— যে পর্যায়েই সংশ্লিষ্টতা থাকুক না কেন, তদন্তকারী তাকে প্রশ্ন করতে পারেন কি না এবং রাষ্ট্রের কোনও সংস্থা ভবিষ্যতে কাউকে তুলে নিয়ে অস্বীকার করার সাহস করলে সত্যিই তার জবাবদিহি হয় কি না।