প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের সমালোচনা করে ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেছেন, তদন্তের প্রক্রিয়া স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করা না হলে তা হবে ‘এক ধরনের বড় ধোঁকা’। তবে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিনের দাবির কিছু বিষয় প্রস্তাবিত আইনে অন্তর্ভুক্ত থাকায় আইনগুলো পুরোপুরি বাতিলের বিপক্ষেও মত দেন তিনি।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সারা হোসেন বলেন, বর্তমান সরকারের তৈরি করা আইনে দুর্বলতা রয়েছে। এটি সংবিধানকে অবজ্ঞা করার পাশাপাশি প্রতিবেশী দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর চেয়েও বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। কারণ, অন্য কোনো দেশে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তের সুযোগ এভাবে বন্ধ করা হয়নি।
সরকারের প্রতি সুপারিশ জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যেন ভুক্তভোগী ও বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আইন দুটিতে স্বাধীন তদন্তের ধারা যুক্ত করে। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া সবার জন্য, এমনকি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের জন্যও, ন্যায়সঙ্গত ও মানবাধিকার রক্ষা করে পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে।
আলোচনা সভায় মানবাধিকারকর্মী ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পরও ভুক্তভোগীদের কথা শুনলে মনে হয় না দেশে কোনো প্রকৃত পরিবর্তন এসেছে।
খসড়া আইনের ত্রুটি তুলে ধরে তিনি বলেন, অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে অভিযোগকারীকে জেলে পাঠানোর বিধান অত্যন্ত অন্যায্য। এতে একাধিক নিরাপত্তা সংস্থার যৌথ নিপীড়ন আড়াল হবে।
তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিদের কাজ নিরাপত্তা বাহিনীকে খুশি করা বা তাদের ইচ্ছেমতো চলা নয়, বরং তাদের নিয়ন্ত্রণ করা। সরকারকে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের স্বার্থে কাজ করার এবং আবু সাঈদ ও মুগ্ধর মতো জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের সঙ্গে কোনোভাবেই বেইমানি না করার সুপারিশ করেন তিনি।
সভায় গুমের ভুক্তভোগী ও ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) বর্তমান সংসদের একজন সদস্য হিসেবে চরম লজ্জা প্রকাশ করে বলেন, গুম ও হেফাজতে নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য যে নতুন খসড়া আইন পেশ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুর্বল।
তিনি অভিযোগ করেন, আইনমন্ত্রী একটি শক্তিশালী আইনের প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রস্তাবিত আইনটি মূলত গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনকে বিকল বা ‘কাগুজে বাঘে’ পরিণত করবে। বিশেষ করে অভিযোগকারী ভুক্তভোগীর অভিযোগ কোনোভাবে ভুল বা মিথ্যা প্রমাণিত হলে তাকে উল্টো সাজা দেওয়ার বিধানের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
আরমান বলেন, এটি মূলত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যা খুশি তাই করার একটি প্রচ্ছন্ন সিগন্যাল দিচ্ছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কিসের ভয়ে এই ‘আবর্জনাতুল্য’ আইন সংসদে আনা হচ্ছে। সংসদ যেন কোনোভাবেই আইনটি পাস না করে এবং আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি যেন এটি সংশোধন করে— সরকারের প্রতি এই সুপারিশ করেন তিনি।
আলোচনা সভায় গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস সংসদে উত্থাপন হতে যাওয়া গুম সংক্রান্ত আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের ফাঁকফোকর তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই আইন দুটির মাধ্যমে মূলত নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে।
বর্তমান সরকারের এই আশ্বাসের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা গুম করবে না। কিন্তু গুম না করলে গুমের পথ বা দরজা কেন খোলা রাখা হচ্ছে?
নাবিলা ইদ্রিস বলেন, আইনে অভিযুক্ত বাহিনীকে নিজেদের ঘটনার তদন্ত করতে দেওয়া বা মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া মূলত সংবিধানের সমঅধিকারের পরিপন্থী। স্বাধীন তদন্তের পথ উন্মুক্ত রাখা এবং বিশেষ করে প্রান্তিক ভুক্তভোগীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইনগুলো অবিলম্বে সংশোধনের সুপারিশ করেন তিনি।
ব্যারিস্টার শায়খ মাহদী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন গুমের মামলাগুলোর অগ্রগতির বিবরণ দিয়ে বলেন, বাহিনীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বন্দি হস্তান্তর ও যৌথ তৎপরতার কারণে গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত অত্যন্ত জটিল।
এই জটিলতা নিরসনে তিনি প্রস্তাবিত আইনে পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করেন। তবে তাদের মূল বাহিনীর কমান্ড স্ট্রাকচার থেকে আলাদা রাখতে হবে এবং তাদের ওপর প্রসিকিউশন দল বা মানবাধিকার কমিশনের মতো কোনো স্বাধীন সংস্থার তদারকি বা তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি মজবুত আইনি কাঠামো এবং অপরাধীদের বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন না করলে যেকোনো সরকারের আমলেই গুমের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তাই নিরাপত্তা কাঠামোকে জবাবদিহিতার আওতাভুক্ত করা জরুরি।









